Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

কারবারিদের সাজা হয় না  

ঝুলে আছে জালটাকার সাড়ে ছয় হাজার মামলা

শরিফ রুবেল 

শরিফ রুবেল 

মে ২৫, ২০২২, ০১:৩২ এএম


ঝুলে আছে জালটাকার সাড়ে ছয় হাজার মামলা

মো. ছগির হোসেন। ১৯৮৭ সালে বরগুনা থেকে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় এসে ইদ্রিসের সাথে পরিচয় হয়। পরিচয়ের সুবাদে তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে ইদ্রিসের মাধ্যমে তার জাল নোট তৈরির হাতেখড়ি। প্রথমে জাল নোট বিক্রি। 

পরে জাল নোট তৈরির বিষয় রপ্ত করেন ছগির। তবে ২০১৭ সালে ইদ্রিস ও ছগির বিপুল জাল নোটসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। ছয় মাস জেল খেটে দুজনই জামিনে মুক্তি পান। কারাগার থেকে বেরিয়ে ২০১৮ সালে পুনরায় জাল নোট তৈরি শুরু করেন। 

ওই বছর আবারো পুলিশ তাদের আটক করে। সেবারও তিন মাস জেল খেটে বেরিয়ে যান। এরপরই একাধিকবার জেলহাজতে আসা-যাওয়া চলে ছগিরের। জাল টাকা বানানো ও বাজারে ছাড়ার কারণে এ নিয়ে মোট ছয়বার গ্রেপ্তার হয়েছেন ছগির ও ইদ্রিস। প্রতিবারই অল্প  সময়ে জামিনে মুক্ত হয়েছেন। জামিনে বেরিয়ে পুনরায় সক্রিয় হয়েছেন জাল টাকা তৈরির কাজে। 

সর্বোচ্চ জেলও খেটেছেন— ১০ মাস। একাধিক মামলাও চলমান। সর্বশেষ মাস দুয়ের আগে আবারো গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে এবারো জামিনে বের হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে জামিনও পেয়েছেন। ছগিরের ২০১৭ সালের মামলাও ঝুলে আছে। মামলাটি এখনো সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। তবে নানা চেষ্টার পরও রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী আদালতে হাজির করতে পারেনি।

শুধু ছগিরই নন, জাল টাকার এমন হাজারো মামলা আদালতে পড়ে আছে যুগের পর যুগ। নিষ্পত্তির হার নেই বললেই চলে। নানা সময়ে জালিয়াত চক্রকে আটক করলেও দ্রুত সময়ে জামিনে বেরিয়ে আসছে। মামলাগুলোর ফলাফলও যাচ্ছে আসামিদের অনুকূলে। এতে টাকা জালিয়াতির মামলায় দেয়া যাচ্ছে না দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। ফলে বছরের পর বছর ঝুলে আছে জাল নোট সংক্রান্ত সাড়ে ছয় হাজার মামলার ভাগ্য। 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জাল টাকার মামলা তদন্তে লাগে বছরের পর বছর। মামলা পরিচালনায় নেই মনিটরিং। সময়মতো সাক্ষীও হাজির হয় না। আটকের সময় প্রত্যাক্ষদর্শীও পাওয়া যায় না। রয়েছে আইন কর্মকর্তাদের গাফিলতি। নেই সাজার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা। এমন নানা জটিলতায় কমেনি বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। ফলে টাকা জালিয়াতচক্র দ্রুত জামিনে মুক্ত হয়ে আবারো একই অপরাধে জড়াচ্ছে। ৫০ বছরেও সাজা নিশ্চিত করা হয়নি, পৃথক আইনও। বিচার সংশ্লিষ্ট নানা দুর্বলতায় আদালতগুলোতে অন্তত সাড়ে ছয় হাজার জাল টাকা তৈরির মামলা ঝুলে আছে। আইনি দুর্বলতার পাশাপাশি রয়েছে লঘু শাস্তির বিধান। 

এছাড়া আইনজীবীদের গাফিলতিসহ নানা কারণে তাদের সাজা নিশ্চিত করা যায় না। এদিকে শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারায় আরো বেপরোয়া হচ্ছে জাল টাকা কারবারিরা। এই তৎপরতা রোধে দ্রুত বিচার শেষ করার দিকে মনোযোগ দেয়ার পরামর্শ ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞদের। বিচার নিশ্চিতে তদন্তকারী সংস্থা ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয় আরো বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তারা। অনেকে বারবার আটক হয়েও জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে। 

আইনজীবীরা বলছেন, বিদ্যমান আইনে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর বিষয়টি থাকায় জাল নোট কারবারিরা ধরা পড়ার পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দ্রুত ছাড়া পায়। হয়রানির ভয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা সাক্ষী হতে চান না। অনেক সময় কোনো সাক্ষী একবার সাক্ষী দিলেও পরের হাজিরার দিন তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। নিজ খরচে বারবার আদালতে আসতেও অনীহা দেখান তারা। যদিও জেলা প্রশাসককে তার যাতায়াত খরচ বাবদ টাকা দেয়ার কথা। 

কিন্তু অভিযোগ আছে, ওই টাকা সরকারি প্রক্রিয়ায় তোলার হয়রানিতে যেতে চান না সাক্ষী। আবার এসব আসামির বেশির ভাগই গ্রেপ্তার হয় ভাড়া বাসা থেকে। জামিন নিয়ে পলাতক হলে অস্থায়ী ঠিকানায় তাদের আর হদিস মেলে না। স্থায়ী ঠিকানায়ও বছরের পর বছর কোনো যোগাযোগ থাকে না তাদের।

আইনজ্ঞরা বলছেন, জাল নোট প্রতিরোধে দেশে আলাদা কোনো আইন নেই। অন্য আইনে বোঝার মতো চাপিয়ে দেয়া হয়েছে জাল টাকার মামলাগুলো। ফলে বিচার আর আলোর মুখ দেখে না। অপরাধীরাও সহজে পার পেয়ে যায়। একটি দুইশ বছর আগের এবং আরেকটি ৫০ বছর আগের আইনের ধারায় বিচার করা হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাল টাকা তৈরি করলেও তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। আবার মামলার বিচারে সাক্ষী হাজিরে  পুলিশ ও সরকারি কৌঁসুলিদের কাজের সমন্বয় নেই। তাদের মধ্যে সমন্বয় হলে বিচার আরো ত্বরান্বিত হবে। এখন দণ্ডবিধি-১৮৬০ এর ৪৮৯(ক)-(ঘ) ধারা এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ এর ২৫(ক) ধারা অনুযায়ী এ সংক্রান্ত অপরাধের বিচার হয়। একই অপরাধ বারবার করা হলেও তাতে শাস্তি বাড়ানোর ধারা নেই বিধিগুলোতে। ফলে একবার জেল থেকে বের হয়ে আবারো নির্ভয়ে জাল টাকার কারবারে জড়িয়ে পড়ছে তারা। 

জানা গেছে, জাল নোট কারবারিদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে নতুন আইন করার উদ্যোগ থমকে আছে দীর্ঘদিন ধরে। ২০১৭ সালে এ সংক্রান্ত গঠিত কমিটি আইনের খসড়া প্রস্তুত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও তার অগ্রগতি নেই। জাল নোটের মামলা নিষ্পত্তিও হচ্ছে অনেক ধীরগতিতে। অনেক ক্ষেত্রে অসমন্বিতভাবে চলছে কার্যক্রম। চার বছর পেরিয়ে গেলেও খসড়াতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে আইনটি। 

আদালত সূত্রে জানা যায়, জানুয়ারি ২০০১ থেকে ২০১১ সালের এ পর্যন্ত জাল টাকা তৈরি করে সরবরাহ ও বাজারজাতকরণে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় সাড়ে ছয় হাজারের বেশি মামলা রয়েছে। 

এগুলো কোনোটি চার্জশিট প্রদান পর্যায়, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং কোনোটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ। এসব মামলায় ব্যতিক্রম দু’-একটি বাদে সব আসামিই এখন জামিনে মুক্ত। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে তারা নবোদ্যমে লেগে যাচ্ছে টাকা জালিয়াতিতে। মামলা হলেও হয় না শাস্তি। এ বছর জানুয়ারি থেকে চলতি মাস পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় ৩৫৬টি মামলা হয় জাল টাকা তৈরির অভিযোগে। 

এসব মামলায় হাতেনাতে আসামি ধরা হলেও অধিকাংশই জামিনে বেরিয়ে আসে। অনেক ক্ষেত্রে প্রধান আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় টাকা জালিয়াতি আরও বিস্তৃতি লাভ করে। অন্যদিকে যে হারে জাল টাকার মামলা হচ্ছে— সে তুলনায় নিষ্পত্তির হার নগণ্য। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় শাস্তি হচ্ছে না। এতে অপরাধীদের মধ্যে কোনো ভীতির সঞ্চার হচ্ছে না। প্রচলিত আইনে (১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫-ক ধারা) রয়েছে বড় ধরনের দুর্বলতা। আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। 

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামীম সরদার বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে প্রসিকিউশনের কিছু গাফিলতি আছে। কোর্ট আছে, আসামি নেই। আসামি আছে, কোর্ট আছে, সাক্ষী নেই। সবই আছে, রেকর্ড নেই। বিভিন্ন কারণে এই মামলাগুলো দীর্ঘসূত্রতায় নিপতিত হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিকার হলো স্পিডি টায়ার।’ 

না প্রকাশে অনিচ্ছুক মামলায় সরকারপক্ষের কৌঁসুলি বলেন, ‘আসামির পিতা ও অন্যান্য স্বজন আছে, এজাহার ও এফআইআরে পিতার নামের জায়গায় ‘মৃত’ লেখা নেই। চিকিৎসার জন্য অন্য কেউ নেই এ কথা সঠিক নয়। আসামি মিথ্যা তথ্য দিয়ে জামিন নিয়েছে। 

ঢাকা বারের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান জানান, জাল নোট প্রতিরোধে দেশে পৃথক কোনো আইন নেই। অনুসৃত আইনে অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া জাল নোট-সংক্রান্ত মামলার শুনানির নির্ধারিত দিনে সাক্ষী প্রায় ক্ষেত্রেই উপস্থিত থাকেন না। এ কারণে মামলার কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। জাল নোটের বাহক অনেক ক্ষেত্রে নিরপরাধ হয়ে থাকেন। ফলে অনেক সময় সাধারণ মানুষও অজ্ঞতাবশত জাল টাকা বহন করার দায়ে ফেঁসে যান। জাল নোটের সংখ্যা মাত্র কয়েক পিস হওয়া সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি ভোগ করা এবং জাল নোট প্রতিরোধে সমন্বিত কার্যক্রম না থাকায় বিদ্যমান আইনে বিচার বিঘ্নিত হচ্ছে।’