তানজিদ সরওয়ার
অক্টোবর ১৫, ২০২৫, ০২:০২ পিএম
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা। কিন্তু যদি সেই ম্যান্ডেট ব্যক্তি নয়, দল বা প্রতীকের হাতে ন্যস্ত হয়, তাহলে গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা ‘জনগণের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব’ কোথায় দাঁড়ায়?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) বা আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি, যেখানে ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দল বা প্রতীকে ভোট দেন। পদ্ধতিটি নতুন নয়; ইউরোপের অনেক দেশেই এটি সফলভাবে চলছে।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির সঙ্গে এটি কতটা খাপ খাবে, সেই প্রশ্ন এখন বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
পিআর কীভাবে কাজ করে : বর্তমান ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (FPTP) পদ্ধতিতে জনগণ প্রত্যেক আসনে সরাসরি প্রার্থীকে ভোট দেন। বিজয়ী প্রার্থী সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু পিআর ব্যবস্থায় প্রতিটি দল একটি ‘দলীয় তালিকা’ দেয়, তালিকায় থাকে সম্ভাব্য সংসদ সদস্যদের নাম। নির্বাচনে জনগণ প্রার্থী নয়, দলকে ভোট দেন। পরে প্রতিটি দল তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন পায় এবং তালিকা অনুযায়ী সংসদ সদস্য মনোনীত করে। এই কাঠামোয় সংসদ সদস্য জনগণের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত হন না; বরং দলের মনোনয়ন ও তালিকার অবস্থানই তার ভাগ্য নির্ধারণ করে।
জবাবদিহির সংকট, জনগণ কার কাছে যাবে : বাংলাদেশের রাজনীতি ব্যক্তিনির্ভর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ভোটারদের সঙ্গে প্রার্থীর সম্পর্ক, এলাকা ঘুরে দেখা, উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি- সবই এই সরাসরি সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। কিন্তু পিআর ব্যবস্থায় ভোটার জানেনই না তার ভোটে কে সংসদে যাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. লুতফর রহমান বলেন, ‘পিআর পদ্ধতিতে ভোটার ও প্রতিনিধির সরাসরি সম্পর্কটি ভেঙে যায়। এতে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির জায়গায় তৈরি হয় দলীয় আনুগত্যের রাজনীতি। সংসদ সদস্যরা জনগণের নয়, দলের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে পড়েন। একজন ভোটার তখন তার নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে প্রশ্নই তুলতে পারেন না, কারণ তিনি জানেনই না সেই প্রতিনিধি কে। ফলে রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিক জবাবদিহির জায়গায় আসে দলীয় আনুগত্য ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা।’
দলীয়করণে আরও গভীর নিমজ্জন : বাংলাদেশে রাজনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দলীয়করণ- প্রশাসন থেকে বিচারব্যবস্থা, এমনকি স্থানীয় সরকার পর্যন্ত দলীয় প্রভাব বিস্তৃত। পিআর পদ্ধতিতে সংসদ সদস্যরা যদি সরাসরি জনগণের বদলে দলের নির্বাচিত তালিকা থেকে আসেন, তবে দলীয় প্রধানের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ আরও বেড়ে যাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মিজানুর রহমানের মতে, ‘পিআর ব্যবস্থায় দলীয় নেতৃত্বই হয়ে ওঠে সর্বেসর্বা। কে সংসদে যাবে, কে বাদ পড়বে- সবই নির্ভর করে দলের শীর্ষ নেতার সিদ্ধান্তের ওপর। এতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীয়তার বদলে তৈরি হয় এক ধরনের ‘দলীয় রাজতন্ত্র’। এটি দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
জোট রাজনীতির নতুন বাধ্যবাধকতা : বিশ্লেষকদের মতে, পিআর পদ্ধতিতে কোনো দলের এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। কারণ আসন বণ্টন হবে ভোটের অনুপাতে। অতএব, জোট সরকার গঠন হবে অবশ্যম্ভাবী।
প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি জোট রাজনীতির উপযোগী? অতীত অভিজ্ঞতা বলে, আমাদের রাজনীতিতে সহযোগিতার চেয়ে অবিশ্বাসই বেশি। ২০০১ থেকে ২০০৬, কিংবা ২০১৪-১৮ সময়কালের জোট অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একাধিক দল ক্ষমতার অংশীদার হলেও সিদ্ধান্ত নেয় একক নেতৃত্ব।
সাবেক একজন নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘জোট সরকার সফল হতে হলে সমঝোতা, ধৈর্য ও সহযোগিতার সংস্কৃতি থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখা হয়। তাই পিআর ব্যবস্থায় যদি বাধ্যতামূলক জোট তৈরি হয়, সেটি স্থিতিশীলতার বদলে নতুন রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে।
দলগুলোর অবস্থান: বিভক্ত রাজনীতি : বর্তমানে পাঁচটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে পিআর পদ্ধতি নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র মতভেদ। একদল বলছে, এটি দেশের ছোট ও আঞ্চলিক দলগুলোর জন্য নতুন অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করবে। অন্য দলগুলো আশঙ্কা করছে, এটি বড় দলগুলোর ক্ষমতাকেন্দ্রকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ভোটারের সরাসরি ক্ষমতাকে খর্ব করবে। ‘পিআর ব্যবস্থায় জনগণের ভোটে প্রতিফলিত হবে জাতীয় মতামত, স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। এতে ছোট দলগুলোও সংসদে আসন পাবে- এটা অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের লক্ষণ।’
বিপরীতে বিরোধী দলের এক নেতা তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘এটি আসলে ক্ষমতা ভাগাভাগির ছদ্মাবরণ। পিআর পদ্ধতিতে জনগণের ভোটে নয়, দলের কৃপায় সংসদ সদস্য নির্ধারিত হবে। এতে গণতন্ত্র নয়, দলতন্ত্রই আরও শক্তিশালী হবে।’
বাংলাদেশের বাস্তবতা: প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতি : বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এখনো ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন। স্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সর্বত্র।
এমন এক প্রেক্ষাপটে পিআর পদ্ধতি চালু হলে সেটি গাণিতিক মডেল হিসেবে কার্যকর হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, নির্বাচনি খরচ, দালালতন্ত্র ও দলীয় নিয়ন্ত্রণ এখনই সর্বোচ্চ পর্যায়ে। পিআর ব্যবস্থায় যদি সংসদ সদস্য মনোনয়ন পুরোপুরি দলের হাতে থাকে, তবে ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ আরও বেড়ে যেতে পারে।
একজন সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘এখানে সমস্যা পদ্ধতির নয়, সংস্কৃতির। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি দলীয় আনুগত্য, ঘুষ ও প্রভাবমুক্ত না হয়, তাহলে যে পদ্ধতিই আসুক, দুর্নীতিই শেষ হাসি হাসবে।’
গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড: জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ : গণতন্ত্রের প্রাণ হলো জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহি। কিন্তু পিআর পদ্ধতিতে জনগণ শুধু ভোটার, প্রতিনিধি নির্বাচনের অংশীদার নয়। এতে ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব ও বিমুখতা তৈরি হতে পারে।
রাজনীতি বিশ্লেষক নাসরিন সুলতানা বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনৈতিক যোগাযোগের বড় শক্তি হলো জনগণের সঙ্গে প্রার্থীর সম্পর্ক। সেটা ভেঙে গেলে ভোটাররা রাজনীতি থেকে আরও দূরে সরে যাবে। এতে গণতন্ত্র নয়, উদাসীনতার সংস্কৃতি তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: সাফল্য ও সতর্কতা : জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড- এমন অনেক দেশে পিআর পদ্ধতি সফলভাবে চলছে। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দলীয় কাঠামো ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক পরিপক্ক। তাদের সমাজে আইনের শাসন ও জবাবদিহি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী, যেখানে কোনো দল এককভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর প্রভাব খাটাতে পারে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘যদি পিআর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়, আগে তৈরি করতে হবে সহনশীল রাজনীতি, স্বচ্ছ প্রশাসন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। নইলে গাণিতিক মডেলটা কাগজেই সুন্দর দেখাবে, বাস্তবে নয়।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন: সংস্কার না কি বিপর্যয় : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পিআর পদ্ধতি নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা নিছক একাডেমিক নয়, এটি রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের পূর্বাভাসও বটে।
বড় দলগুলো নিজেদের ক্ষমতাকেন্দ্র সুরক্ষিত করতে চায়, ছোট দলগুলো চায় সংসদে জায়গা। কিন্তু জনগণ চায় তাদের ভোটের মূল্য, তাদের প্রতিনিধির জবাবদিহি। যদি সেই অধিকার দলীয় তালিকায় হারিয়ে যায়, তবে গণতন্ত্র কেবল সংখ্যার খেলায় পরিণত হবে। গণতন্ত্রের ম্যান্ডেট যেন গাণিতিক সমীকরণে হারিয়ে না যায়।
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা যদি স্থানান্তরিত হয় দলীয় নেতৃত্বের হাতে, তবে গণতন্ত্র শুধু নামেই থাকবে। পিআর পদ্ধতি হতে পারে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির নতুন দরজা, আবার সেটি হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক অচলাবস্থারও সূচনা। সবকিছু নির্ভর করছে আমরা কি সত্যিই গণতন্ত্র চর্চা করতে চাই, নাকি কেবল তার মুখোশ পরেই চলতে চাই।