নিজস্ব প্রতিবেদক
মে ২৩, ২০২৬, ১২:৪১ এএম
বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্য উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (United States Department of Agriculture) সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, টানা এক দশকের প্রবৃদ্ধির পর প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক চাল উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে খাদ্যনিরাপত্তা, বাজার স্থিতিশীলতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মে মাসে প্রকাশিত বৈশ্বিক শস্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ মৌসুমে বিশ্বব্যাপী চাল উৎপাদন কমে প্রায় ৫৩ কোটি ৮০ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। এটি ২০১৫ সালের পর প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক চাল উৎপাদনে বার্ষিক পতনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রধান চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে ভারত, মিয়ানমার এবং যুক্তরাষ্ট্র-এ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
ভারতে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, মিয়ানমারে কৃষি উৎপাদনে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে আবহাওয়া পরিবর্তন ও পানিসংকট এই তিনটি কারণকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কারণে শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলোয় ফলন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই তিন দেশের উৎপাদন কমে গেলে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়া প্রায় অনিবার্য।
চাল বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার প্রধান খাদ্যশস্য। ফলে উৎপাদন কমে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাজারে। খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশ্ব খাদ্য বিশ্লেষকদের মতে, চালের দাম বৃদ্ধির ফলে বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতোমধ্যেই কয়েকটি অঞ্চলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক চাল উৎপাদন কমার অন্যতম প্রধান কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনিশ্চিত আবহাওয়া। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং তাপপ্রবাহ কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় এসব অঞ্চলে প্রভাব আরও তীব্র হচ্ছে। জমির উর্বরতা হ্রাস, সেচ ব্যবস্থার সংকট এবং উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশগুলোকে দ্রুত কৃষি নীতি পুনর্বিন্যাস করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ, জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বিত নীতি গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন তারা। বিশ্বের বড় চাল রপ্তানিকারক দেশগুলো ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, যদি বড় দেশগুলো রপ্তানি সীমিত করে, তবে বৈশ্বিক বাজারে দ্রুত দাম বাড়তে পারে এবং খাদ্য সংকট আরও গভীর হতে পারে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষ করে যেসব দেশ চাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। খাদ্য আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ভর্তুকির চাপ এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এসব দেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে অনেক দেশে খাদ্য সংকট সামাজিক অস্থিরতার কারণও হতে পারে। সর্বোপরি, এক দশকের মধ্যে প্রথমবার বৈশ্বিক চাল উৎপাদনে সম্ভাব্য পতন বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত। উৎপাদনকারী দেশগুলোর আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং নীতি-সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এখনই সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণ না করলে খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।