ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

দেশে জ্বালানি নিরাপত্তার শঙ্কা

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

জুন ১৩, ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম

দেশে জ্বালানি নিরাপত্তার শঙ্কা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও শিল্পায়নের মূল চালিকাশক্তি হলো প্রাকৃতিক গ্যাস, যার এক বিশাল অংশ দীর্ঘ ছয় দশক ধরে জুগিয়ে আসছে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র ‘তিতাস’। তবে অতিমাত্রায় উত্তোলন এবং নতুন কোনো বড় মজুত আবিষ্কৃত না হওয়ায় বর্তমানে তিতাসের বুকে ফুরিয়ে আসছে এই মহামূল্যবান খনিজ সম্পদ।

তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের উত্তোলনযোগ্য মজুতের প্রায় ৮০ শতাংশই ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, যার ফলে বিগত পাঁচ বছরের ব্যবধানে এর দৈনিক উৎপাদন ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। এককভাবে দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এই উৎসের ধারাবাহিক পতনকে সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক অশনি সংকেত বা ‘অ্যালার্ম বেল’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

একদিকে শিল্প-কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ জোগান হ্রাস পাওয়ায় দেশ দ্রুত পুরোপুরি আমদানিনির্ভর (এলএনজি) হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। এই পরিস্থিতি কেবল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরই প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং স্থবির করে দিচ্ছে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোর উৎপাদন চাকা। তিতাস-৩১ নম্বর কূপের মতো গভীর অনুসন্ধান কিংবা নতুন কূপ সংস্কারের সাময়িক তৎপরতা চললেও, একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই মহাপরিকল্পনা ছাড়া দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা এখন এক গভীর খাদেরকিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।

গ্যাস অনুসন্ধানে সক্রিয় করা হচ্ছে বাপেক্সকে- বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী : দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)-কে আরও সক্রিয় ও সক্ষম করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকা গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান। জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, গত প্রায় ১৭ বছরে স্থল ও সমুদ্র উভয় অঞ্চলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ঘাটতি ছিল। ফলে দেশীয় জ্বালানি সম্পদ উন্নয়নের পরিবর্তে আমদানিকেন্দ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে।

তিনি জানান, অতীতে একাধিক সফল গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও বাপেক্সকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এটিকে পুনরায় শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে বাপেক্সের জন্য অতিরিক্ত পাঁচটি ড্রিলিং রিগ সংগ্রহের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, যা অনুসন্ধান কার্যক্রমে গতি আনবে।

সমুদ্রসীমা অর্জনের পরও দেশের অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলন ও রপ্তানি শুরু করলেও বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্লক বরাদ্দ দেয়া হবে। তবে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বাপেক্সের প্রযুক্তিগত ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন তিনি। এ কারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো হলেও বর্তমান বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।

সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। তবুও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের তেল ক্রয় করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপের বিষয়েও তিনি আলোকপাত করেন। তার ভাষ্যানুযায়ী, অতীতে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে সরবরাহ করার ফলে বড় ধরনের ভর্তুকির বোঝা তৈরি হয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া দায় ছিল, যা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ব্যবহূত ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির ওপর কর ও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ খাতে সংস্কার কার্যক্রমের সুফল আগামী দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে দৃশ্যমান হবে এবং দেশের জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

১৯৬২ সালে পাকিস্তান আমলে আবিষ্কৃত হওয়া তিতাস গ্যাসক্ষেত্রটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার বছর আগে, অর্থাৎ ১৯৬৮ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। দেশের জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করে আসা এই ক্ষেত্রটি দীর্ঘকাল ধরে দেশের অন্যতম বৃহত্তম ও নির্ভরযোগ্য উৎস। কিন্তু প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়মে ভূগর্ভের এই খনিজ সম্পদ একসময় ফুরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে।

পেট্রোবাংলা ও গ্যাস ফিল্ডস সূত্র মতে, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের উত্তোলনযোগ্য মজুতের প্রায় ৮০ শতাংশ গ্যাসই ইতোমধ্যে উত্তোলন করা শেষ হয়ে গেছে। বাকি ২০ শতাংশ গ্যাস দিয়ে আর কতদিন চলা যাবে, তা নিয়েই এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। উৎপাদনের পরিসংখ্যান : মাত্র পাঁচ বছর আগেও তিতাস গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস উৎপাদিত হতো। বর্তমানে তা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে নেমে এসেছে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।

অর্থাৎ, বিগত কয়েক বছরে দৈনিক উৎপাদন কমেছে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে একমাত্র শেভরন পরিচালিত ‘বিবিয়ানা’ গ্যাসক্ষেত্র ছাড়া দেশের আর কোনো গ্যাসক্ষেত্রই উৎপাদনের দিক থেকে তিতাসের কাছাকাছি নেই। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এককভাবে দেশের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা বিবিয়ানা থেকেও উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা তিতাসের এই পতনকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, একটি গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস একদিন শেষ হবে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য যে আগাম প্রস্তুতি ও অনুসন্ধান চালানো উচিত ছিল, সেখানে এক বিশাল ঘাটতি রয়ে গেছে। বাপেক্সের (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। শুধু তিতাস নয়, আমাদের মূল ভরসাস্থল বিবিয়ানা থেকেও উৎপাদন কমছে।

অথচ এর বিপরীতে দেশের গ্যাসের চাহিদা আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুধু গ্যাস ব্যবহার করেই যাচ্ছি, কিন্তু নতুন কোনো বড় মজুত জাতীয় গ্রিডে যোগ করতে পারিনি। বাপেক্স গত ১০ বছরে কিছু গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে সত্য, তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেগুলোর বেশিরভাগই আকারে ছোট। ফলে তা ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে পারছে না।’

একই সুরে সুর মিলিয়েছেন বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন। তিনি মনে করেন, ব্যবস্থাপনার অভাব ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয়ার কারণেই আজকের এই সংকট। তিনি বলেন, ‘আমরা কয়েক দশক ধরে এই ক্ষেত্র থেকে গ্যাস তুলছি। গ্যাস শেষ হবে এটা জানার পরও আমরা হাত গুটিয়ে বসে ছিলাম। আমাদের যে আগাম প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল, বাস্তবে তার তীব্র ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। তবে এখনো আশা শেষ হয়ে যায়নি। দেশীয় উৎস থেকে আরও বেশি গ্যাস পাওয়া সম্ভব, যদি আমরা অনুসন্ধানে পূর্ণ গতি ফেরাতে পারি। তা না হলে দেশ পুরোপুরি আমদানিনির্ভর (এলএনজি) হয়ে পড়বে, যা আমাদের অর্থনীতির পক্ষে বহন করা অসম্ভব।’

তিতাসের উৎপাদন পতন ঠেকাতে এবং দেশের গ্যাস সংকট কাটাতে বর্তমান কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) এবং বাপেক্স যৌথ ও এককভাবে তিতাস ও এর আশপাশের এলাকায় নতুন করে অনুসন্ধান ও পুরোনো কূপ সংস্কারের (ওয়ার্কওভার) কাজ জোরদার করেছে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আশার আলো দেখাচ্ছে তিতাস-৩১ নম্বর কূপ। এটি স্থলভাগে দেশের প্রথম গভীর অনুসন্ধান কূপ।

তিতাস-৩১ নম্বর কূপ : এখানে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত থাকতে পারে বলে ভূতাত্ত্বিক জরিপে ধারণা করা হচ্ছে। এই গভীর স্তরের অনুসন্ধান সফল হলে দেশের জ্বালানি খাতে এক বিশাল স্বস্তি ফিরবে। চলতি অন্যান্য প্রকল্প : বর্তমানে তিতাস-২৮, তিতাস-২৯ এবং তিতাস-৩০ নম্বর কূপ খনন ও উন্নয়নের কাজ পুরোদমে চলছে।

বিজিএফসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আব্দুল জলিল প্রামাণিক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমরা এখন প্রথাগত স্তর ছেড়ে আরও গভীর স্তরে অনুসন্ধান চালাচ্ছি। একই সঙ্গে তিতাস-২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর কূপের কাজ চলছে। এই কূপগুলোর খনন কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হলে দৈনিক উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে এবং আমরা জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে একটি স্বস্তিদায়ক অবস্থানে পৌঁছাতে পারব।’

তিতাস ও অন্যান্য দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে।

শিল্প খাতে স্থবিরতা : নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুরসহ দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের তীব্র সংকটে কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক (জগএ) ও টেক্সটাইল ডাইং কারখানাগুলো চাহিদামতো গ্যাস না পাওয়ায় সময়মতো রপ্তানি অর্ডার সরবরাহ করতে পারছে না। বিদ্যুৎ সংকট : দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটা বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক। গ্যাসের সরবরাহ কমায় বাধ্য হয়ে তেলভিত্তিক বা আমদানিকৃত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা সরকারের ভর্তুকির চাপ এবং লোডশেডিং দুটোই বাড়িয়ে দিচ্ছে। এলএনজি আমদানির চাপ : দেশীয় গ্যাস কমায় চড়া মূল্যে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

শুধু তিতাসের ওপর নির্ভর করে বসে না থেকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করেছেন— ১. স্থলভাগে ব্যাপক অনুসন্ধান : দেশের পাহাড়ি অঞ্চল ও অবিন্যস্ত অববাহিকায় বাপেক্সকে আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে আরও বেশি অনুসন্ধান কূপ খননের সুযোগ দিতে হবে। ২. সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধান : বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আকর্ষণীয় পিএসসি দিয়ে দ্রুত গভীর ও অগভীর সমুদ্রে ব্লু-ইকোনমির সুবিধা নিতে হবে। ৩. বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি : দেশীয় একমাত্র অনুসন্ধান সংস্থা বাপেক্সকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্ত করে আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা প্রদান করা জরুরি।

তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, ‘সহজ ও সস্তা’ গ্যাসের দিন বাংলাদেশে ফুরিয়ে আসছে। তিতাস-৩১ নম্বর কূপের মতো গভীর অনুসন্ধান কিংবা নতুন কূপ খনন সাময়িক উপশম দিতে পারলেও, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পুরো জ্বালানি নীতিতেই বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে আমদানিনির্ভরতার আত্মঘাতী পথ পরিহার করে দেশীয় স্থলভাগ ও সমুদ্রবক্ষে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও মহাপরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। নচেৎ, তিতাসের শুকিয়ে যাওয়া স্রোতের মতোই স্থবির হয়ে পড়তে পারে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা।

Link copied!