ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

ষষ্ঠ শিরোপার লক্ষ্যে ব্রাজিলের ‘স্মার্ট ভেস্ট’ বাজি

ক্রীড়া ডেস্ক

ক্রীড়া ডেস্ক

জুন ১৪, ২০২৬, ১২:১৬ এএম

ষষ্ঠ শিরোপার লক্ষ্যে ব্রাজিলের ‘স্মার্ট ভেস্ট’ বাজি

ফুটবল ইতিহাসে ব্রাজিলের চেয়ে সফল কোনো দেশ নেই। পাঁচটি বিশ্বকাপ ট্রফি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তৈরি হওয়া ফুটবল কিংবদন্তিরা বিশ্বমঞ্চে সেলেসাওদের এক অপরাজেয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু গত পাঁচটি বিশ্বকাপে (২০০২ সালের পর থেকে) কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ায় এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের ভাগ্য ফেরাতে মরিয়া লাতিন আমেরিকার এই পরাশক্তি। আর এই লক্ষ্যে মাঠের কৌশলের পাশাপাশি পর্দার আড়ালে এক অভিনব প্রযুক্তিগত বিপ্লবের ওপর ভরসা করছে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন।

মরক্কোর বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের অভিযান শুরু করল ব্রাজিল। তবে এই মাঠের লড়াইয়ের অনেক আগে থেকেই স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট বা ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা দলের তারকা খেলোয়াড়দের প্রতিটি নড়াচড়া ট্র্যাক করছেন। উদ্দেশ্য একটাই- ‘স্মার্ট ভেস্ট’ বা পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে ডেটা (তথ্য) সংগ্রহ করে কোচ কার্লো আনচেলত্তি এবং তার টিম ম্যানেজমেন্টকে নিখুঁত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা।

ব্রাজিলের পেশাদার ফুটবলাররা সাধারণত অনুশীলনের সময় এবং ঘরোয়া লিগের ম্যাচগুলোতে তাদের জার্সির নিচে এক ধরনের বিশেষ সেন্সরযুক্ত ভেস্ট বা গেঞ্জি পরিধান করেন। দেখতে মেয়েদের স্পোর্টস ব্রা-এর মতো এই হালকা ওজনের ভেস্টগুলোর ভেতরে থাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক পারফরম্যান্স অ্যান্ড ট্র্যাকিং সিস্টেম। ভেস্টের পেছনে থাকা একটি পকেটে এই ডিভাইসটি থাকে, যা মাঠে খেলোয়াড়ের অবস্থান এবং চলাচলের গতি নিখুঁতভাবে মাপে।

ভেস্টের সেলাইয়ের ভেতরেই লুকানো থাকে হূৎস্পন্দন মাপার ইলেকট্রোড, যা খেলোয়াড়ের শারীরিক ধকলের রিয়েল-টাইম ডেটা সরবরাহ করে। এই ভেস্টগুলোর মাধ্যমে একজন খেলোয়াড়ের স্প্রিন্ট স্পিড (দৌড়ের গতি), হার্ট রেট (হূৎস্পন্দন), ক্লান্তি বা ফ্যাটিগের মাত্রা এবং চোট থেকে সেরে ওঠার গতি সংক্রান্ত সব তথ্য লাইভ রেকর্ড করা হয়। বিগত এক দশকে এই প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে এবং এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেয়া অধিকাংশ দলই এই ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করছে।

জাতীয় দলের কোচদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তারা ক্লাব কোচদের মতো খেলোয়াড়দের প্রতিদিন কাছে পান না। ব্রাজিলের তারকা ফুটবলাররা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের, ভিন্ন ভিন্ন মহাদেশের লিগে খেলেন। ইউরোপের প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা থেকে শুরু করে ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগ- সব জায়গার খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের তুলনা করা এবং কার শারীরিক অবস্থা কেমন তা দূর থেকে বোঝা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু ব্রাজিল এই প্রযুক্তির ব্যবহারে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। তারা পুরুষ, নারী এবং যুব দল- সব স্তরে এই ট্র্যাকিং ব্যবস্থা একীভূত করেছে।

ব্রাজিল জাতীয় দলের স্পোর্টস সায়েন্স প্রধান গুইলহের্ম পাসোস বলেন, দৈনন্দিন ভিত্তিতে যখন খেলোয়াড়রা আমাদের সাথে ক্যাম্পে থাকেন না, তখন আমরা তাদের নিজ নিজ ক্লাবের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। ক্লাবগুলো আমাদের ট্র্যাকিং সিস্টেমের ডেটা পাঠিয়ে দেয়। ফলে আমাদের কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে সেই তথ্য যুক্ত করে খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। এর ফলে হাজার মাইল দূরে থাকা নেইমার জুনিয়র বা অন্য কোনো তারকার পেশির অবস্থা বা ক্লান্তির মাত্রা কেমন, তা ব্রাজিলের থিংক-ট্যাংক ঘরে বসেই জানতে পারছে।

কোচ কার্লো আনচেলত্তি যখন বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে শুরুর একাদশ  বা কৌশল নির্ধারণ করেন, তখন এই ডেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ফুটবলে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি খুবই সাধারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। গুইলহের্ম পাসোসের মতে, একজন খেলোয়াড় চোট থেকে সেরে ওঠার পর সে কতটা উচ্চ গতিতে দৌড়াতে পারছে, তা এই ভেস্টের মাধ্যমে মাপা হয়। যদি কোনো খেলোয়াড় স্বাভাবিক গতির চেয়ে কম দৌড়ায়, তবে বোঝা যায় তার পেশি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এর ফলে খেলোয়াড়কে পুনরায় চোটে পড়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।

কোনো খেলোয়াড় যদি অত্যন্ত দ্রুতগামী  হন, তবে কোচ তাকে কাউন্টার-অ্যাটাকিং (পাল্টা আক্রমণ) কৌশলে উইঙ্গার হিসেবে ব্যবহার করার কথা ভাবতে পারেন। আবার ডেটা যদি দেখায় কোনো খেলোয়াড়ের ক্লান্তি বেশি, তবে তাকে শুরু থেকে না খেলিয়ে ম্যাচের শেষ ২০ মিনিটে ‘ইমপ্যাক্ট সাবস্টিটিউট’ বা বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামানোর সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হয়।

এই ট্র্যাকিং শুধু বিশ্বকাপের আগের প্রস্তুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, ম্যাচ চলাকালীন এবং দুটি ম্যাচের মধ্যবর্তী মাত্র কয়েকদিনের বিরতিতে খেলোয়াড়দের রিকভারি বা ক্লান্তি দূর করার প্রক্রিয়া তদারকি করতেও এটি ব্যবহূত হবে।

এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে বিবিসির ‘টেকএক্সপ্লোর’  সিরিজের উপস্থাপক পল কার্টার যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন লিগ্যাসি (একটি নারী ফুটবল দল) এর অনুশীলন ক্যাম্পে অংশ নেন। স্পোর্টস টেকনোলজি কোম্পানি ‘ক্যাটাপুল্ট’-এর তৈরি একটি স্মার্ট ভেস্ট পরে পল যখন মাঠে নামেন, তখন চমকপ্রদ কিছু তথ্য সামনে আসে। অনুশীলনের পর দেখা যায় পলের হূৎস্পন্দন মিনিটে ১৭৭ বার  ছুঁয়েছে। সবচেয়ে বড় চমক ছিল ‘প্লেয়ার লোড’ নামক মেট্রিক্সে। দেখা গেল, একজন পেশাদার ফুটবলারের তুলনায় পল সমপরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করতে গিয়ে অনেক বেশি শারীরিক ধকল বা লোড তৈরি করেছেন। অর্থাৎ, পেশাদার খেলোয়াড়দের শরীর যতটা দক্ষ বা এফিশিয়েন্ট, সাধারণ মানুষের শরীর ততটা নয়; সাধারণ মানুষকে অল্প দৌড়াতেও অনেক বেশি শক্তি অপচয় করতে হয়।

বোস্টন লিগ্যাসি এফসির হেলথ অ্যান্ড পারফরম্যান্স ডিরেক্টর ড্যান জোন্স জানান, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা চোট থেকে ফিরে আসা এক নারী খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে সঠিক সময়ে তুলে নিয়েছিলেন। রিয়েল-টাইম ডেটায় যখন দেখা যায় ওই খেলোয়াড় তার জন্য নির্ধারিত নিরাপদ দৌড়ের সীমা পার করে ফেলেছেন, তখনই কোচকে বলে তাকে সাবস্টিটিউট করা হয়, যা তাকে পুনরায় চোট পাওয়া থেকে বাঁচায়।

প্রযুক্তির এই জয়জয়কারের মধ্যেও ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা একটি বিষয়ে সতর্ক করেছেন, বেশি ডেটা মানেই সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। ফুটবল কোনো অ্যাথলেটিক্স বা দৌড় প্রতিযোগিতা নয়। এখানে যে বেশি দৌড়াবে, সেই ভালো খেলোয়াড়- এমন ভাবা ভুল। গুইলহের্ম পাসোস তার ক্যারিয়ারের একটি চমৎকার উদাহরণ শেয়ার করেন (যার নাম তিনি বিশ্বকাপের কৌশলের স্বার্থে গোপন রেখেছেন)। একবার ট্র্যাকিং ডেটায় দেখা গেল, আমাদের একজন খেলোয়াড় পুরো ম্যাচে মাত্র ৬ কিলোমিটার (৩.৭ মাইল) দৌড়েছেন। যেখানে দলের বাকিরা প্রায় ১২ কিলোমিটার দৌড়াচ্ছিলেন। সংখ্যার দিক থেকে মনে হচ্ছিল সে অলস বা খারাপ খেলছে।

কিন্তু আমরা যখন ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করলাম, তখন দেখলাম ‘হি ওয়াজ অলওয়েজ ইন দ্য রাইট স্পট’ (সে সবসময় নিখুঁত কৌশলগত অবস্থানে দাঁড়িয়ে ছিল)। সে অত্যন্ত দক্ষ একজন খেলোয়াড় ছিল, যার বাড়তি দৌড়ানোর প্রয়োজনই ছিল না। পাসোস আরও যোগ করেন, অনেক সময় কোনো খেলোয়াড়ের শারীরিক ডেটা চমৎকার থাকা সত্ত্বেও কোচ তাকে দলে নেন না। কারণ মানসিকভাবে বা টেকনিক্যালি সে হয়তো কোচের খেলার ধরনের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না। ফুটবলারদের মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষমতা এখনো কোনো যন্ত্রের নেই।

২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ছোঁয়া কেবল এই পরিধানযোগ্য ভেস্টেই থেমে নেই। এবারই প্রথম ফিফা এবং প্রযুক্তি জায়ান্ট লেনোভোর যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করা হচ্ছে, যার নাম ‘ফুটবল এআই প্রো’। এটি মেশিন লার্নিং এবং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং প্রযুক্তির সাহায্যে কোটি কোটি ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করে কোচ এবং খেলোয়াড়দের তাৎক্ষণিক বা ইনস্ট্যান্ট ফিডব্যাক প্রদান করতে সক্ষম।

এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট বা স্মার্ট ভেস্ট- সব কিছুই আধুনিক ফুটবলের চেহারা বদলে দিচ্ছে। ব্রাজিল দল এই ডেটার সর্বোত্তম ব্যবহার করে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক দল হিসেবে মাঠে নামতে প্রস্তুত। তবে গুইলহের্ম পাসোসের কথাতেই লুকিয়ে আছে আসল সত্য। প্রযুক্তির পেছনে যে বিশেষায়িত মানুষগুলো বসে আছেন এবং ডেটা বিশ্লেষণ করে বাস্তব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, পার্থক্যটা সেখানেই তৈরি হয়।

যন্ত্র হয়তো তথ্য দিতে পারে, কার্লো আনচেলত্তিকে সাহায্য করতে পারে সেরা একাদশ বেছে নিতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ট্রফি বা মাঠের গৌরব নির্ধারিত হবে মানুষের মেধা, ফুটবলীয় জাদু এবং চাপের মুখে খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেই। সাম্বা নৃত্যের ছন্দে প্রযুক্তির এই ফিউশন ব্রাজিলকে হেক্সা বা ষষ্ঠ শিরোপা এনে দিতে পারে কি না, তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পুরো বিশ্ব।

Link copied!