জুন ২৮, ২০২৬, ১২:১৬ এএম
দীর্ঘ দুই বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য অত্যন্ত স্বস্তির খবর নিয়ে আবারও উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। আগামী মাত্র এক থেকে দুই মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হবে বলে প্রবল আশা প্রকাশ করছে সরকার। তবে এবারের প্রক্রিয়ায় আসছে আমূল এক পরিবর্তন। এবার আর মালয়েশিয়া নয়, বাংলাদেশ নিজেই রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করার একক অধিকার লাভ করতে যাচ্ছে।
এই সুযোগে অতীতের কুখ্যাত সিন্ডিকেট ও রন্র্লে রন্র্লে থাকা দুর্নীতি চিরতরে এড়াতে সরকার ও এজেন্সিগুলোর একটি সমন্বিত উদ্যোগের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তবে অর্থনৈতিক ও অভিবাসন বিশ্লেষকদের স্পষ্ট সতর্কবার্তা, কর্মী পাঠানোর প্রতিটি ধাপে যদি শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে আবারও ধাক্কা খেতে পারে দেশের অন্যতম প্রধান এই জনশক্তি রপ্তানি খাত। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও সম্ভাবনাময় বৈদেশিক শ্রমবাজার হিসেবে বিবেচনা করা হয় মালয়েশিয়াকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিশাল বাজারটিকে ঘিরে বরাবরই অনিয়ম, চরম অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন ব্যয় ও প্রভাবশালী চক্রের সিন্ডিকেটের অভিযোগ ছিল। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়—
২০০৮ থেকে ২০১৬: অনিয়মের অভিযোগে ২০০৮ সালে মালয়েশিয়া প্রথমবার বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া বন্ধ করে। দীর্ঘ আট বছর নানামুখী আলোচনার পর ২০১৬ সালে বাজারটি আবারও চালু হয়।
২০১৮ সালের বন্ধ: দুর্নীতির মাত্রা ব্যাপক আকার ধারণ করায় চালুর মাত্র দুই বছরের মাথায়, অর্থাৎ ২০১৮ সালে আবারও বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া স্থগিত করে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ।
২০২২ সালের ক্ষণস্থায়ী আলো: ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে একটি নতুন সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও আমলাতান্ত্রিক ও নীতিগত জটিলতায় বাজার খুলতে প্রায় তিন বছর লেগে যায়। পরবর্তীতে ২০২২ সালের আগস্ট থেকে পুনরায় কর্মী যাওয়া শুরু হয়।
২০২৪ সালের সর্বশেষ ধাক্কা: অনিয়ম যেন পিছু ছাড়ছিল না। ফলে ২০২৪ সালের ১ জুন আবারও সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার দ্বার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ দুই বছর ধরে দুই দেশের সরকারের মধ্যে বিভিন্ন কঠোর শর্ত শিথিল ও সংস্কার নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা চলতে থাকে।
সমপ্রতি বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে টেবিলে তোলা হয়। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের এই ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের আইনি ও নীতিগত জটিলতাগুলো দ্রুত কাটিয়ে শ্রমবাজার আবারও চালু হবে বলে প্রবল আশা প্রকাশ করছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)।
সংগঠনটির সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘দুই দেশের সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আলোচনা করে যে সিদ্ধান্ত নেবে এবং কর্মী প্রেরণের যে আধুনিক পদ্ধতি নির্ধারণ করবে, আমরা দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সেই নির্দিষ্ট পদ্ধতিতেই কর্মী পাঠাতে শতভাগ প্রস্তুত। আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা, যত দ্রুত সম্ভব এই স্থবিরতা কাটিয়ে কর্মী পাঠানো শুরু হোক।’ অতীতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার মূল কারণ ছিল রিক্রুটিং এজেন্সির ‘সিন্ডিকেট’। এ প্রসঙ্গে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূর এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক তথ্য দিয়েছেন।
তিনি জানান, যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির আসন্ন বৈঠকে সব এজেন্ডা চূড়ান্তভাবে সমাধান হলে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হলো, কর্মীরা যাতে সম্পূর্ণ ‘জিরো কস্ট’ বা বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় যেতে পারেন, সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে বর্তমান সরকার। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এই জিরো কস্টে কর্মী নেয়ার নীতিগত বিষয়ে চূড়ান্ত সম্মতি জানিয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূর আরও জানান, এবার কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া নয়, বরং বাংলাদেশ সরকার নিজেই যোগ্য ও স্বচ্ছ রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করবে। অতীতের নিয়ম অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষই বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্বাচন করে দিত। যার ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হতো এবং সিন্ডিকেট তৈরির সমস্ত দায় বা দুর্নাম এসে পড়ত বাংলাদেশের ওপর। যৌথ ওয়ার্কিং কমিটিতে এই পুরোনো বৈষম্যমূলক ধারাটি সংশোধনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিচ্ছে।
সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির মতো পুরনো কলঙ্কজনক বিতর্ক এড়াতে এখন থেকেই সরকার ও দেশের সাধারণ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন জনশক্তি রপ্তানিকারকরা। বায়রার সাবেক সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সরকার যদি সব রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতি একটি ইতিবাচক ও বৈষম্যহীন ভূমিকা নেয় এবং তাদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি ও তদারকি নিশ্চিত করে, তবে আমরা রপ্তানিকারকরাও আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে সরকারের বৃহৎ কর্মসংস্থান পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারব।’
অন্যদিকে, দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কর্মী পাঠানোর প্রতিটি ধাপে যদি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে আগামী পাঁচ বছরে বিদেশে প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করার যে রাষ্ট্রীয় ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘সরকার যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার জিরো টলারেন্স নীতিতে সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে, তবে এমন একটি যুগোপযোগী ও ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা মোটেও কঠিন নয়, যার মাধ্যমে সাধারণ গ্রামীণ শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। বিষয়টি এখন পুরোপুরি সরকারের দৃঢ় নীতিগত সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে।’
২০২৪ সালে হঠাৎ বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে মালয়েশিয়ার সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও দেশটিতে যেতে না পারা ৭ হাজার ৮৭৩ জন ভাগ্যবিড়ম্বিত কর্মীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল সরকারি একমাত্র জনশক্তি প্রেরণকারী সংস্থা বোয়েসেলকে। সরকারি বিশেষ তদারকির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত তাদের মধ্য থেকে প্রায় ৩ হাজার ভুক্তভোগী কর্মী সফলভাবে মালয়েশিয়ায় যেতে সক্ষম হয়েছেন। তবে বাকি থাকা সাড়ে চার হাজারেরও বেশি কর্মীর ভাগ্য এখনও ঝুলে রয়েছে।
তাদের বিষয়েও যাতে সরকার খুব দ্রুত একটি পৃথক ও মানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তার জোর দাবি জানিয়েছেন অভিবাসন খাতের অংশীজনরা। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এক বিশাল চালিকাশক্তি। দীর্ঘ দুই বছর পর এই বাজারটি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা দেশের বেকার যুবকদের মনে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করেছে। তবে অতীতে বারবার সিন্ডিকেটের করাল গ্রাসে এই সম্ভাবনাময় বাজারটি যেভাবে বন্ধ হয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নেয়া অত্যন্ত জরুরি। এবার যেহেতু বাংলাদেশ নিজেই রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের ক্ষমতা পাচ্ছে এবং ‘জিরো কস্ট’ বা বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে, তাই এই প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত রাখা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
