জুন ১৩, ২০২৩, ১২:০১ এএম
বরিশাল ও খুলনায় দুই সিটিতেই নৌকার জয়। বিএনপি নির্বাচনে না গেলেও দুই সিটিতিতে ছিল তাদের কাউন্সিলর প্রার্থী। যদিও তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। আশঙ্কা ছিল ভোটার উপস্থতি নিয়ে। তবে ইসি জানিয়েছে, খুলনায় ৪২ ও বরিশালে ৫০ শতাংশ ভোট পড়েছে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দৃশ্যমান সর্বশক্তি নিয়োগের পরও আওয়ামী লীগের সৎ, সজ্জন হিসেবে পরিচিত প্রার্থী আজমত উল্লা খান হেরে যান। জায়েদা খাতুন জেতার পর জাহাঙ্গীর আলম তখন জানিয়েছেন— এ জয় নৌকার, এ জয় শেখ হাসিনার। এরপর এ দুই সিটিতে জয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয় ক্ষমতাসীন দল। দীর্ঘ প্রায় এক সপ্তাহ এক ডজন কেন্দ্রীয় নেতা ভোটের মাঠে অবস্থান নেন। অবশেষে নৌকার ঘরেই ফিরল বিজয়। দলীয় কোন্দল, ঘরোয়া বিবাদের মধ্যে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ (খোকন সেরনিয়াবাত) বিজয় লাভ করেন।
অন্যদিকে খুলনায় তৃতীয়বারের মতো সিটির নগরপিতা হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক। ক্ষমতাসীন দল বলছে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের জনপ্রিয়তা এ ভোটে প্রমাণ হলো। আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও তাদের ঘরেই এভাবে বিজয় ফিরে আসবে। জনগণ শেখ হাসিনার নৌকার ওপর ভরসা রাখবে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম আমার সংবাদকে বলেন, নৌকা এবং শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তার কাছে কোনো ষড়যন্ত্রই অতীতে টেকেনি। বরিশাল এবং খুলনায় তা প্রমাণিত, আগামীতে বিজয়ের জন্য অবশ্যই এটি সাহসের বার্তা...
বিবাদেও খোকনের বাজিমাত
- রক্ত ঝরল বরিশালে, উত্তপ্ত ছিল নগরী
- সিইসি বললেন, রক্তাক্ত আপেক্ষিক, উনি কি ইন্তেকাল করেছেন?
- হামলাকারীদের ছাড় নয় শাস্তি পেতেই হবে— ঘোষণা ইসির
- চাচাকে ভোট দেননি সাদিক আবদুল্লাহ
বরিশাল ব্যুরো: বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বেসরকারিভাবে মেয়র নির্বাচিত হলেন আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ (খোকন সেরনিয়াবাত)। ১২৬টি ভোটকেন্দ্রের ভোট গণনা শেষে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ ফয়জুল করিমকে ৫৩ হাজার ৪০৭ ভোটের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নতুন মেয়র হলেন তিনি। নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৭৫২ ভোট। আর, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সৈয়দ ফয়জুল করিম পেয়েছেন ৩৪ হাজার ৩৪৫ ভোট। ঘরোয়া বিবাদ থেকে রাজনীতিতে এসেই বাজিমাত দেখালেন খোকন। দলীয় কোন্দল, ঘরোয়া বিবাদের মধ্যে তার এই জয় তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেছেন রাজনীতিবিদরা। এই নির্বাচনের মনোনয়ন পাওয়া থেকে প্রচার-প্রচারণার শেষ দিন পর্যন্ত খোকন সেরনিয়াবাত পাশে পাননি আগের দফায় নির্বাচিত মেয়র সাদিক আবদুল্লাহকে। এমনকি বরিশালে ভোট দিতেও আসেননি খায়েরের বড়ভাই হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে সাদিক। মেয়র পদে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর ভোটার ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন আ.লীগের প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত। সেই সঙ্গে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছেন তিনি।
এর আগে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হাতে রক্তাক্ত হয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের মেয়রপ্রার্থী মুফতি মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। এতে তিনিসহ দলের বেশ কিছু নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে দলটির কয়েকশ নেতাকর্মী লাঠি হাতে বিক্ষোভ করেন। এতে নগরীতে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। তাদের ঠেকাতে পুলিশ নগরীর প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করে। এ ছাড়া দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে, নেতাকর্মীদের মারধর, হয়রানি, পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়া, কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেয়া, ভোটারদের বাধা দেয়া। হাতপাখা প্রতীক ফয়জুল করীমের মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বলা হয়, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) কমিশনারের কাছে অভিযোগগুলো জানানো হয়েছে।
এর আগে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর ২২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেরা খাতুন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে হাতপাখার প্রার্থী ফয়জুল করীমের ওপর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হামলা করে। এ ঘটনায় ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা তাৎক্ষণিক সিঅ্যান্ডবি রোডে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করেন। ফয়জুল করীমের ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে তার অনুসারীরা চরমোনাইসহ বরিশালের বিভিন্ন এলাকা থেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে নগরীতে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। পুলিশ আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতুর ঢালে তাদের আটকে দিলে তারা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বরিশাল-পটুয়াখালী সড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ বরিশাল নগরীর সব প্রবেশপথে নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করে। পাশাপাশি ওই সব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল বাড়ানো হয়।
ইসলামী আন্দোলনের সমর্থক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের শায়েখের ওপর হামলা করা হয়েছে, তা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আমরা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে আছি। নির্দেশ এলেই সড়ক অবরোধের ডাক দেবো।’ হামলার বিষয়ে মেয়রপ্রার্থী সৈয়দ ফয়জুল করীম বলেন, ‘সাবেরা খাতুন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার পর হাতেম আলী কলেজ চৌমাথার কাছে এলে নৌকার ৩০ থেকে ৪০ জন সমর্থক তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল ব্যবহার করে। হামলায় তিনিসহ সঙ্গে থাকা বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন।’ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবন থেকে সকাল থেকেই সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আহসান হাবিব খান (অব.), বেগম রাশেদা সুলতানা ও মো. আলমগীর সিসি ক্যামেরা মনিটরিং করেন। ভোট শুরুর তিন ঘণ্টার মাথায় ভোটার উপস্থিতি নিয়ে স্বস্তির কথা জানান নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আহসান হাবিব খান। তিনি জানান, ইভিএমে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কোথাও বিশৃঙ্খলাও নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন পরিস্থিতি সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ফয়জুল করীমের ওপর হামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, মুফতি মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের ওপর যে ব্যক্তি হামলা করেছে, তাকে কোনোভাবে ছাড় দেয়া হবে না। তাকে শাস্তি পেতেই হবে।
এ ছাড়া বরিশালে হাতপাখার প্রার্থীর রক্তাক্ত হওয়াটা ‘আপেক্ষিক’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেছেন, ‘উনি (প্রার্থী) কি ইন্তেকাল করেছেন? না, উনি কি কতটা— আমরা যেটি দেখেছি, ওনার কিন্তু রক্তক্ষরণটা দেখিনি। যতটা শুনেছি, ওনাকে কেউ পেছন দিক থেকে ঘুষি মেরেছে। ওনার বক্তব্যও শুনেছি, উনিও বলেছেন, ভোট বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না। আমাকে আক্রমণ করা হয়েছে।
সিইসি বলেন, আক্রমণের ঘটনার বিষয়ে জানার সঙ্গে সঙ্গে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ভোট বাধাগ্রস্ত হয়নি। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন দু-চারটি ঘটনা ছাড়া সার্বিক অর্থে সুন্দর ও সুচারুভাবে নির্বাচন হয়েছে। কমিশন সন্তুষ্ট। এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, তারা ধারণা করছেন, খুলনায় ৪২ থেকে ৪৫ শতাংশ এবং বরিশালে ৫০ শতাংশ ভোট পড়তে পারে। এদিকে স্থানীয় আ.লীগের নেতাকর্মীরাও হাজেরা খাতুন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ফয়জুল করীমের ওপর হামলার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ঘটনাস্থলে থাকা দলটির কর্মী শফিকুল ইসলাম ও আবদুর রহিমের অভিযোগ, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আ.লীগের একজন নারী কর্মীর ব্যাগে হাত দিয়েছেন। তার সঙ্গে থাকা কার্ড টেনে ছিঁড়ে ফেলেছেন। এ সময় ওই নারী কর্মীর শরীরের স্পর্শকাতর অংশে হাত লাগে। এতে দলীয় নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর ২ নম্বর ওয়ার্ডের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে ফয়জুল করীমকে অবরুদ্ধ করে রাখেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। এর প্রায় আধঘণ্টা পর সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন মুফতি ফয়জুল করীম। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, কেন্দ্রে অনিয়ম হচ্ছে। আ.লীগের লোকজন তার এজেন্টদের বের করে দিচ্ছে। এমন খবর পেয়ে কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে তিনি সরকারি দলের কর্মীদের হামলার মুখে পড়েন। তবে আ.লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী বহিরাগতদের নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করেছেন। ফলে তারা মুফতি ফয়জুল করীমকে বুঝিয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছেন।
আ.লীগের মেয়রপ্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহর প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট মো. আফজালুল করিম অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা একত্রিত হয়ে শহরে ঢোকার চেষ্টা করছে। এ ব্যাপারে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। বরিশালে জাতীয় পার্টির মেয়রপ্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপসও আ.লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেয়ার অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, নগরের ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাজীপাড়া কেন্দ্রে ছাত্রলীগের কর্মীরা নারী ভোটারদের বাধা দিচ্ছে। আ.লীগের ছেলেরা রাস্তা থেকে ভোটারদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। তারা বলছে, আপনাদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার দরকার নেই।
ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, আমাদের পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, পাসপোর্ট সাইজের ছবি এনেছেন কেন? স্ট্যাম্প সাইজ লাগবে। এভাবে নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন তারা। আমি ভোট দিতে গেলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেলেনি, তখন প্রিসাইডিং অফিসার সহায়তা করায় ভোট দিতে পেরেছি। বরিশালের স্বতন্ত্র মেয়রপ্রার্থী কামরুল আহসান রুপনও দুটি কেন্দ্রে এজেন্টদের ঢুকতে না দেয়ার অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘দুটি কেন্দ্রে আমার এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। সেখানে বলা হচ্ছে, এজেন্ট কার্ডে প্রার্থীর স্বাক্ষর না হলে হবে না। কিন্তু আমার প্রধান নির্বাচনি এজেন্টের স্বাক্ষর রয়েছে সেখানে। আবার বলা হচ্ছে, রাতে এজেন্টদের ফরম কেন দেয়া হয়নি। কিন্তু আমি জানি ভোটগ্রহণের আগে এজেন্ট ফরম দিলেই হয়। খবর পেয়ে আমার প্রধান নির্বাচনি এজেন্টকে পাঠানো হয়েছে।’
চাচাকে ভোট দেননি মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ : বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট দেয়নি বর্তমান মেয়র ও মহানগর আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। গত ২৬ মে প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর থেকেই বরিশালের বাইরে অবস্থান করছেন তিনি। সোমবার ভোটের দিনও তিনি বরিশালে ফেরেননি। এ নিয়ে ভোটের মাঠে নানা আলোচনা চলছে। বরিশাল সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে এবার আ.লীগের মনোনয়ন পান সাদিক আবদুল্লাহর চাচা আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাত। মনোনয়ন নিয়ে শুরু থেকেই চাচা-ভাতিজার মধ্যে বিভেদ চলছিল। এই বিভেদ ঘোচাতে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা নানামুখী তৎপরতা চালান। সাদিক আবদুল্লাহ ও তার বাবা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর অনুসারী আ.লীগ নেতারা শুরু থেকেই দূরে ছিলেন। প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর দূরে থাকা নেতারা নিজেদের মতো করে প্রচার চালালেও অবিশ্বাস দূর হয়নি। খায়ের আবদুল্লাহ তার বিশ্বস্ত নেতাকর্মীদের নিয়েই পুরো নির্বাচনি কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন।
খুলনায় খালেকের হ্যাটট্রিক
- ইভিএমে অনিয়মের অভিযোগ জাপা ও চরমোনাইয়ের
- নৌকা ছাড়া অন্যদের পোলিং এজেন্ট সংকট
- ভোটকেন্দ্রে ভিড় করায় চারজনকে দণ্ড
- ৪২ থেকে ৪৫ শতাংশ ভোট পড়েছে —ইসি
খুলনা ব্যুরো: তৃতীয়বারের মতো খুলনা সিটির নগরপিতা হলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক। নির্বাচনে ২৮৯টি কেন্দ্রের ফলাফল পাওয়া গেছে। এতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন এক লাখ ৫৪ হাজার ৮২৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুল আউয়াল হাতপাখা প্রতীকে পেয়েছেন ৬০ হাজার ৬৪ ভোট। গতকাল সোমবার (সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে টানা ভোটগ্রহণ। ভোট নেয়া হয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএমে)। খুলনা সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে আ.লীগ মনোনীত প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক (নৌকা) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত আব্দুল আউয়াল (হাতপাখা) ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টি মনোনীত শফিকুল ইসলাম মধু (লাঙল), জাকের পার্টি মনোনীত এস এম সাব্বির হোসেন (গোলাপফুল) এবং একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম শফিকুর রহমান মুশফিক (দেয়াল ঘড়ি)।
এদিকে নির্বাচনে সাধারণ ৩১টি ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে ১৩৬ জন, ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৩৯ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে এস এম খুরশিদ আহমেদ টোনা এবং ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে জেড এ মাহমুদ ডন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।এ সিটিতে ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৯ জন। এদের মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ৬৮ হাজার ৮৩৩ জন এবং নারী দুই লাখ ৬৬ হাজার ৬৯৬ জন।
খুলনায় নির্বাচনি উত্তাপ অপেক্ষাকৃত কম থাকলেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ইসলামী আন্দোলনের মেয়রপ্রার্থী মো. আব্দুল আউয়াল। তার অভিযোগ, কিছু জায়গায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে হাতপাখায় ভোট দিলেও সে ভোট চলে যাচ্ছে নৌকায়। রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানান, খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৪২ থেকে ৪৫ শতাংশ ভোট পড়েছে।
খুলনায় কারচুপির আশঙ্কা জাপা প্রার্থী মধুর : খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কারচুপির আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির মেয়রপ্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধু। গতকাল খুলনা কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোটদান শেষে এমন আশঙ্কার কথা জানান তিনি। শফিকুল ইসলাম মধু বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি-না সে বিষয়ে শঙ্কা রয়েছে। এ সরকারের অধীনে আগে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। তাই আজকের ভোটও সুষ্ঠু হবে না। আর ইভিএমের ভোটে কারচুপির আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটদানে ধীরগতিরও অভিযোগ করেন তিনি। জানান, নয়াবাটি পল্লীমঙ্গল ও মোল্লাপাড়া সরকারি স্কুল কেন্দ্রে ইভিএম কাজ করছে না। জানা গেছে, এই কেন্দ্রে মোট ভোটার দুই হাজার ১০৯ জন। তিন ঘণ্টায় সেখানে ১১ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রিসাইডিং অফিসার মো. শাহ জামান।
ভোটকেন্দ্রের ভিড় চারজনকে দণ্ড : ভোটকেন্দ্রের সামনে ভিড় করায় খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে চারজনকে আটক করে দণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। দুপুরে নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের ন্যাশনাল গার্লস হাই স্কুলের সামনে থেকে আটক করা হয়। তারা হলেন— আকরাম হোসেন, তাওহীদুল ইসলাম, আব্দুস সামাদ ও মিরাজুল ইসলাম। আদালত সূত্র জানায়, এক ওয়ার্ডের ভোটার অন্য ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্রের সামনে ভিড় করায় চারজনকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের দণ্ড দেয়া হয়। এর মধ্যে আকরাম হোসেনকে ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। তাওহীদুল ইসলাম, আব্দুস সামাদ ও মিরাজুল ইসলামকে অন্য এলাকায় প্রবেশ না করার শর্তে মুচলেকা নিয়ে মুক্তি দেয়া হয়। নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আটক ব্যক্তিরা ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার। তারা ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে প্রবেশ করে ভোটকেন্দ্রের সামনে বিশৃঙ্খলা করছিলেন। তাদের জরিমানা ও মুচলেকা নেয়া হয়েছে।’
নৌকা ছাড়া অন্যদের পোলিং এজেন্ট সংকট : খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে (কেসিসি) নৌকার প্রার্থী ছাড়া অন্য প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টের সংকট রয়েছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে নৌকা ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট থাকলেও অন্য মেয়র প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট নেই বললেই চলে।
তবে সাধারণত নির্বাচনগুলোতে পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি এমন অভিযোগ শোনা গেলেও খুলনাতে নৌকা ছাড়া অন্য প্রার্থীরাই ছিলেন পোলিং এজেন্ট সংকটে। সকাল থেকে নগরীর ভেতরে ও বাইরে প্রায় ১৫টি কেন্দ্র ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে শুধু নৌকা ও কাউন্সিলর প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট ছিল। আবার কোনো কেন্দ্রে লাঙল ও হাতপাখার পোলিং এজেন্ট থাকলেও শুধু একজনকেই পুরো কেন্দ্রে পাওয়া গেছে। সকালে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী আব্দুল আউয়াল জানিয়েছেন, তার সব কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট ছিল কিন্তু সব বুথে নেই। তবে তার পোলিং এজেন্টের সংখ্যা তিনি জানাতে চাননি।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুুক এক কর্মী বলেন, তারা ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট দিয়েছেন। ১০ শতাংশে দিতে পারেননি। তিনি জানান, কেন্দ্রে দিলেও সবগুলা বুথে পোলিং এজেন্ট নেই তাদের। এর কারণ হিসেবে বলেন, তার দল ৩২ বছর ক্ষমতায় নেই তাই অনেকেই পোলিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে চাচ্ছে না। এ জন্য তারা পোলিং এজেন্ট সংকটে পড়েছেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র হালদার জানান, তার কেন্দ্রে নৌকার পোলিং এজেন্ট থাকলেও অন্যান্য প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট নেই।
