চট্টগ্রাম ব্যুরো
জানুয়ারি ১৬, ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
রাজধানীতে নিহত ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির খুনিদের গ্রেপ্তার এবং মামলার ত্রুটিপূর্ণ অভিযোগপত্র বাতিলের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর আয়োজিত এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে চরম আলটিমেটাম দিয়েছেন আন্দোলনকারী নেতারা। সমাবেশ থেকে এক ছাত্রনেতা এমনও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, বিচারের দাবিতে টালবাহানা করা হলে চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে।
দুপুর ২টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের সামনে থেকে ইনকিলাব মঞ্চের চট্টগ্রাম নগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলে কয়েক হাজার নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
মিছিলটি নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করার সময় ‘তুমি কে, আমি কে, হাদি, হাদি’, ‘জাস্টিস ফর হাদি’ এবং খুনিদের ফাঁসির দাবিতে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়। বেলা আড়াইটার দিকে মিছিলটি কাজীর দেউড়ি মোড়ে এসে পৌঁছালে সেখানে এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুনে হাদি হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
সমাবেশে সবচেয়ে কড়া বক্তব্য দেন ইনকিলাব মঞ্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক রাফসান রাকিব। পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী কি আমাদের সঙ্গে টালবাহানা করছে? আপনারা কি মনে করেছেন আমরা রাজপথ ছেড়ে দেব?
সরকারকে লক্ষ্য করে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, যদি আপনারা টালবাহানা করতেই থাকেন, তাহলে এ চট্টগ্রাম থেকে ঘোষণা দিচ্ছি, প্রয়োজনে চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেব। তার এ বক্তব্যে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
তিনি দাবি করেন, হাদি হত্যার চার্জশিটে সঠিক তথ্য উঠে আসেনি এবং মূল অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চট্টগ্রামের সাবেক নেতা ইবনে হোসেন জিয়াদ সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, শহীদ হাদি হত্যার বিচার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার টালবাহানা শুরু করেছে। আমরা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই, যদি দ্রুততম সময়ে প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত না করা হয়, তবে আইন উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং প্রয়োজনে পুরো অন্তর্বর্তী সরকারকে অপসারণের আন্দোলন শুরু করা হবে।
জুলাই ঐক্য চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়কারী আবরার হাসান রিয়াদ সমাবেশে অভিযোগ তোলেন যে, তদন্তকারী কর্মকর্তারা তড়িঘড়ি করে একটি দায়সারা অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, চার্জশিটে অত্যন্ত ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। আমাদের ইনকিলাব মঞ্চের ভাইয়েরা সে ভুলগুলো চিহ্নিত করেছেন। মূল আসামিদের বাদ দিয়ে দেওয়া এ চার্জশিট আমরা মানি না। অবিলম্বে সংশোধিত চার্জশিট জমা দিয়ে প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তার করতে হবে, না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন মডেল থানাধীন বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান বিন হাদিকে গুলি করা হয়। এ ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে একটি হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। গুলিবিদ্ধ হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এরপর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
গত ৬ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিবি পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ আদালতে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তবে মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল জাবের দাবি করেন, চার্জশিটটি অসম্পূর্ণ এবং এতে অনেক মূল অপরাধীর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। গত ১২ জানুয়ারি তিনি আদালতে চার্জশিট পর্যালোচনার সময় নেন এবং গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে পুলিশের দেওয়া এ অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে ‘নারাজি’ দাখিল করেন।
আজকের এ সমাবেশকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম নগরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। কাজীর দেউড়ি মোড়ে অবস্থান নেওয়ার ফলে দীর্ঘ সময় যান চলাচল ব্যাহত হয়। তবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বিক্ষোভকারীরা সমাবেশ শেষ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইনকিলাব মঞ্চের নেতার পক্ষ থেকে ‘চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন করার’ মতো চরম বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে এ আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে যদি সরকার বা প্রশাসন থেকে কোনো সদুত্তর না পাওয়া যায়, তবে তারা চট্টগ্রাম বন্দর বা মহাসড়ক অবরোধের মতো আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেবেন।
ইএইচ