বরিশাল ব্যুরো
এপ্রিল ৫, ২০২৬, ০৪:৫৪ পিএম
মৌসুমি ফল তরমুজ বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। বরিশাল নগরীর কীর্তনখোলা নদী সংলগ্ন বিআইডব্লিউটিএ’র ইজারাকৃত বালুরঘাট এলাকার প্রভাশালী সিন্ডিকেটের কাছে প্রতিবছরের মত এবছর তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না দুরদুরান্ত থেকে আসা তরমুজ চাষী ও ব্যবসায়ীরা।
প্রায় ৩২টিরও বেশি বাণিজ্যিক আড়ৎ নির্মাণ করে চাষিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ওই সিন্ডিকেট চক্র।
অভিযোগ উঠেছে- ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে সেখানে অবৈধভাবে ৩২টিরও বেশি বাণিজ্যিক আড়ৎ নির্মাণ করে তরমুজ বেচাকেনার হাট বসানো হয়েছে।
স্থানীয় এই প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধাপে কৃষক ও পাইকারদের কাছ থেকে দফায় দফায় চাঁদা ও বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক কৃষক ও ব্যবসায়ীরা, আর সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বালুরঘাটের সরকারি জমিতে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে অন্তত ৩২টি আড়ৎ ঘর গড়ে তোলা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি আড়ৎ বসানোর জন্য আড়ৎ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবস্থান ভেদে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রশাসন ও ঘাটের ইজারাদারের নাম ভাঙিয়ে প্রতিদিন প্রতিটি আড়ৎ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। সরকারি জায়গায় ব্যক্তিগত বাণিজ্য চালু করায় রাজস্ব পাচ্ছে না বিআইডব্লিউটি।
বিভাগের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রলারে করে তরমুজ নিয়ে আসা কৃষকরা এখানে নেমেই সিন্ডিকেটের মুখে পড়ছেন। ট্রলার ভেড়ানোর সাথে সাথেই পার্কিং বাবদ ১০০ টাকা দিতে হয় পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নামে। এছাড়াও টলার প্রতি বাংলাদেশ কার্গো ট্রলার বাল্কহেড শ্রমিক ইউনিয়নের নামে দিতে হয় ৬০ টাকা।
কৃষকের অভিযোগ- ঘাটে তরমুজ নিয়ে আসলে আড়ৎদারদের মাধ্যম ছাড়া সরাসরি পাইকারের কাছে তরমুজ বিক্রির কোন উপায় নেই। বাধ্য হয়ে আড়ৎদারের মাধ্যমে বিক্রি করলে প্রতি ১০০ টাকায় ৫ থেকে ৬.২৫ টাকা পর্যন্ত আড়ৎদারি দিতে হচ্ছে। এর বাইরেও শ্রমিক খরচ বাবদ প্রতি পিস তরমুজে ৩ টাকা করে গুণতে হয় কৃষককে। খাট ইজারা বাবদ প্রতি পিস তরমুজ ৮০ পয়সা করে দিতে হয়।
আড়ৎদারদের সাথে কথা বলে জানা যায়- ওই অঞ্চলে অবস্থিত আড়ৎগুলোর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটির বৈধ কাগজপত্র থাকলেও বেশির ভাগ আড়তের অনুমোদন নেই। মৌসুমি ফল বিক্রির জন্যই এ সব আড়ৎ মালিকরা গড়ে তুলেছেন অনুমোদনহীন আড়ৎ।
আর অনৈতিক সুবিধা পেতে তাদের সহযোগীতা করছেন ইজারাদাররা। আর এ সব বিষয়ে কোন হস্তক্ষেপ করছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কথিত রয়েছে- মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করা করায় তারা বিষয়টি এড়িয়ে চলেন।
শুধু কৃষক নয়, হয়রানির শিকার হচ্ছেন পাইকাররাও। আড়ৎ থেকে তরমুজ কিনে ট্রাকে তোলার সময় বিভিন্ন ধাপে বকশিশ ও নেতাদের নামে চাঁঁদা আদায় করা হয়। এছারাও ঘাটে ট্রাক পার্কিং বাবদ চাঁদ ও দিনের বেলায় নগরীতে ট্রাক চলাচল ও পার্কিং বাবদ ট্রাফিক পুলিশের নামেও একটি চাঁদা আদায় করা হয় পাইকার ও ট্রাক চালকদের কাছ থেকে।
এমনকি ট্রাকে তরমুজ সাজানোর জন্য প্রয়োজনীয় হোগলা বাইরে থেকে কেনার কোন সুযোগ নেই। ঘাট এলাকায় অবস্থানরত একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট থেকে চড়া মূল্যে (প্রতি পিস ১২০ থেকে ১৪০ টাকা) হোগলা কিনতে বাধ্য করা হয়।
এর বাইরে বালুরঘাটে প্রতি পিস তরমুজে খাজনা ও ট্রাক পার্কিংয়ের জন্য ঘাট ইজারাদারকে দিতে হয় বিশাল অঙ্কের টাকা।
গোপন সূত্রে জানা গেছে, এই পুরো চক্রের নেপথ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতা ও বালুরঘাটের ইজারাদার ও বিআইডব্লিউটিএসহ প্রশাসনের একটি মহলের যোগসাজশ রয়েছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। কৃষকদের দাবি- ক্ষেত থেকে তরমুজ নিয়ে ঘাটে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতি পিসে প্রায় ৩০-৪০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়ে যায় এই সিন্ডিকেটের কারণে।
কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন, বালুরঘাটে ট্রাকে তরমুজ লোড করার মতো যদি স্থান না থাকে, তাহলে আমাদের পাঠানো হয় কেডিসি এলাকার বিআইডব্লিউটিএর ঘাটে। সেখানে পার্কিং বাবদ ট্রলার প্রতি নেয়া হয় ১২০০ টাকা। এছাড়াও ট্রাক পার্কিং বাবদ সেখানে মোটা অঙ্কের খাজনা দিতে হয়।
ট্রলার চালকদের অভিযোগ- বালুরঘাটে তরমুজবাহী ট্রলার পার্কিং বাবদ নৌ-পুলিশসহ প্রশাসন ম্যানেজ করার কথা বলে ট্রলার প্রতি নেয়া হয় ১০০ টাকা। এছাড়াও ঘাটের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও বাড়তি টাকা নিচ্ছে ইজারাদার।
ভুক্তভোগী কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, এই সিন্ডিকেটের কারণে তরমুজের উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা ন্যায্য মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাধারণ ক্রেতারাও চড়া দামে তরমুজ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
এ বিষয়ে বালুরঘাট ইজারাদার খাজা মহম্মদ ইকবাল বলেন, ট্রলার পার্কিং বাবদ যে ১০০ টাকা নেয়া হয়, সেটা আমার জানা নেই। তবে এটা বিআইডব্লিউটিএ নেয় মনে হয়। এছাড়াও ট্রাক পার্কিং যে খরচটা নেয়া হয় ট্রাক ট্রান্সপোর্টের লোকজন নেয়। ঘাটে ট্রাক পার্কিংয়ে যারা সহযোগিতা করে ওরা হয়তো ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে নেয় ট্রাক প্রতি।
অস্থায়ী বাণিজ্যিক আড়ৎ থেকে অগ্রীম টাকা নেওয়ার বিষয় এবং প্রতিদিন চাঁদা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা অগ্রীম কোন টাকা নেই নি। তবে আমরা খাল খনন এবং বর্ষায় এই ঘাটটি খানাখন্দ হয়ে যায় সেই পাড়ের অংশ জায়গা বালু ও ইট দিয়ে ভরাটের জন্য আড়ৎ প্রতি ১ হাজার করে টাকা নিয়েছি।
বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা ইজারা শর্ত মেনেই ঘাটটি ইজারা দিয়েছি। তারা শর্ত ভঙ্গ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই চাঁদাবাজি ও অবৈধ আড়ৎ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ ও স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি জোরদার করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
এএন