মিরাজ আহমেদ, মাগুরা
এপ্রিল ২২, ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম
মাগুরায় বিদ্যুৎ সংকট এখন আর সাময়িক ভোগান্তি নয়, এটি রূপ নিয়েছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার এক স্থায়ী সংকটে। চাহিদা ও সরবরাহের স্পষ্ট বৈষম্য, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং সমন্বয়হীনতার কারণে দিন-রাত লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে পুরো জেলার জনজীবন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্যেই সংকটের চিত্র স্পষ্ট। ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ঘোষ জানান, তাদের আওতায় প্রায় ৪৪ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে মাগুরায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৪ মেগাওয়াট হলেও বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ এককভাবেই ৮ মেগাওয়াট ঘাটতি নিয়ে চলতে হচ্ছে এই অংশকে।
অন্যদিকে মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য আরও উদ্বেগজনক। সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. মহিতুল ইসলাম বলেন, প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে জেলায় চাহিদা ৬৪ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যায় মাত্র ৪২ থেকে ৪৫ মেগাওয়াট। দিনের বেলায় পরিস্থিতি আরও খারাপ। চাহিদা ৫৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ নেমে আসে ৩০ থেকে ৩২ মেগাওয়াটে।
এত বড় ঘাটতির মধ্যেও প্রশ্ন উঠছে, কেন আগে থেকে কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ ঘাটতি নতুন নয়, কিন্তু তা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে প্রতি বছরই একই সংকট আরও তীব্র হয়ে ফিরে আসছে।
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. তাজুল ইসলাম জানান, জেলায় ২৭ হাজারের বেশি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র এবং ২ হাজারের বেশি বিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা রয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে প্রায় ৩৯ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হলেও বর্তমান সংকট সেই সম্ভাবনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
শিক্ষা খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর জেলায় ৩১টি কেন্দ্রে মোট ১০ হাজার ৭০৪ জন এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। কিন্তু ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে তাদের প্রস্তুতি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। গরমের মধ্যে দীর্ঘ লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবাও ঝুঁকির মুখে। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জরুরি সেবা যেমন ফায়ার সার্ভিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র শিল্পেও এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু বিদ্যুৎ ঘাটতিই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অব্যবস্থাপনা, দুর্বল সমন্বয় এবং জবাবদিহির অভাব। তারা বলছেন, চাহিদা-সরবরাহের এই ব্যবধান দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকলেও কার্যকর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা, লোড ম্যানেজমেন্ট বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
প্রশ্ন উঠছে, জেলার উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব থাকা সত্ত্বেও কেন এই মৌলিক সেবায় এমন বিপর্যয়কর অবস্থা বিরাজ করছে। বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং পরিকল্পনার অভাবই কি এর মূল কারণ এমন প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
মাগুরাবাসীর প্রত্যাশা, দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, ন্যায্য বরাদ্দ এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে দ্রুত এই সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তা না হলে লোডশেডিং শুধু ভোগান্তি নয়, জেলার সামগ্রিক উন্নয়নকেই দীর্ঘমেয়াদে থমকে দেবে এমন আশঙ্কাই এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
এএন