বিশেষ প্রতিবেদক, চুয়াডাঙ্গা
জুলাই ২৭, ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলা, প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সুসংহত করার লক্ষ্যে চুয়াডাঙ্গা জেলায় বাস্তবায়িত হলো এক দৃষ্টান্তমূলক কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ সংক্রান্ত সরাসরি নির্দেশনা বাস্তবায়নে চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এই বৃহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর আওতায় জেলার চার উপজেলার ৫ হাজার কৃষকের মাঝে ২৫ হাজার চারা গাছ, প্রয়োজনীয় খুঁটি ও জৈব সার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চুয়াডাঙ্গা খামারবাড়ির উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. মাসুদুর রহমান সরকার এবং অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিপি) মিঠু চন্দ্র অধিকারীর সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও দক্ষ নেতৃত্বে মাঠ পর্যায়ে সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে এ কর্মসূচি। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং পরিচ্ছন্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগটি কেবল চুয়াডাঙ্গাতেই নয়, বরং সারা দেশের জন্য এক অনন্য অনুকরণীয় মডেলে পরিণত হয়েছে।
কর্মসূচির পেছনের প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত গুরুত্ব
একটি দেশের পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) স্বাভাবিক রাখতে মোট ভূখণ্ডের অন্তত ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা অপরিহার্য। বর্তমানে বাংলাদেশে আনুমানিক মাত্র ১৪.৫ শতাংশ বনভূমি রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলার ক্ষেত্রে চরম সংকট তৈরি করছে। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা চুয়াডাঙ্গায় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দিন দিন তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনাবৃষ্টির প্রকোপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই সংকটময় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ অভিযান জোরদার করার নির্দেশ প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশনার আলোকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন খাতের আওতায় চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এই বিস্তৃত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নেয়। কর্মসূচির মূল লক্ষ্য কেবল পরিবেশের ভারসাম্য উদ্ধার নয়, বরং ফলজ ও ঔষধি গাছ রোপণের মাধ্যমে কৃষকদের পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন।
চারা গাছ ও কৃষি উপকরণ বিতরণের রূপরেখা
চুয়াডাঙ্গা জেলার চার উপজেলা- চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগরের মোট ৫,০০০ জন কৃষক এবং বিভিন্ন শিক্ষা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানকে এই প্রণোদনার আওতায় আনা হয়। কৃষকদের পাশাপাশি স্থানীয় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও পরিবেশ সুরক্ষায় এসব চারা সরবরাহ করা হয়েছে।
উপজেলাভিত্তিক তদারকি ও বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন
খামারবাড়ির শীর্ষ কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট উপজেলা সমূহে ইউএনও এবং উপজেলা কৃষি অফিসারদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে চারা বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
চুয়াডাঙ্গা সদরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তিথি মিত্র এবং উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আনিছুর রহমানের সমন্বয়ে চারা বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

আলমডাঙ্গার ইউএনও জনাব শাহীনূর আক্তার এবং উপজেলা কৃষি অফিসার জনাব মো. মাসুদ হোসেন পলাশের ব্যবস্থাপনায় উপজেলার কৃষকদের হাতে উপকরণ তুলে দেওয়া হয়।

দামুড়হুদার ইউএনও লাভলী ইয়াসমিন এবং উপজেলা কৃষি অফিসার শারমিন আক্তারের নেতৃত্বে বিতরণ কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

জীবননগরের ইউএনও সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি এবং উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আলমগীর হোসেনের সার্বিক পর্যবেক্ষণে চারা ও উপকরণ পৌঁছে দেওয়া হয়।
উপকরণ বিতরণের তালিকা ও পরিমাণ
গাছের চারা: প্রতি কৃষক/প্রতিষ্ঠান ৫টি করে (মোট ২৫,০০০টি চারা)
চারাগাছের খুঁটি: প্রতি কৃষক/প্রতিষ্ঠান ৫টি করে (মোট ২৫,০০০টি খুঁটি)
জৈব সার: প্রতি কৃষক/প্রতিষ্ঠান ২৫ কেজি করে (মোট ১,২৫,০০০০ কেজি)
জাতের বৈচিত্র্য ও কার্যকারিতা
পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা সর্বোচ্চ করতে মোট ২৫ জাতের ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা নির্বাচন করা হয়েছে। বিতরণকৃত চারাগুলোর মধ্যে আম, জাম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো ফলজ বৃক্ষ যেমন কৃষকের পুষ্টি জোগাবে ও বাড়তি আয়ের সুযোগ দেবে, তেমনি নিম, অর্জুন ও বহেরার মতো ঔষধি বৃক্ষ গ্রামীণ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সরকারি কোষাগারে ৪০ লাখ টাকা ফেরত
সাধারণত সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় বা অপচয়ের অভিযোগ দেখা গেলেও, চুয়াডাঙ্গার এই কর্মসূচিতে সততা ও আর্থিক শৃঙ্খলার নজির তৈরি হয়েছে। কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে সরকার থেকে সর্বমোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৭২,৪৫,৫০০ টাকা।
খাতভিত্তিক খরচের হিসাব
উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. মাসুদুর রহমান সরকার ও অতিরিক্ত উপপরিচালক মিঠু চন্দ্র অধিকারীর কঠোর মনিটরিং এবং সঠিক দরকষাকষির ফলে উপকরণের গুণগত মান বজায় রেখেও বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হয়। বিতরণ শেষে বেঁচে যাওয়া ৪০,৬২,৫০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত প্রদান করা হয়েছে, যা সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনায় এক বিরল দৃষ্টান্ত।
দীর্ঘমেয়াদী মনিটরিং ও চারা পুনঃস্থাপন নীতি
গাছ রোপণের চেয়ে তা টিকিয়ে রাখা বেশি চ্যালেঞ্জিং। তাই চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চারা বিতরণ করেই দায়িত্ব শেষ করেনি, বরং প্রতিটি গাছের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সুসংহত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করেছে।
মাঠ পর্যায়ের তদারকি: উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ (SAAO) সরাসরি কৃষকের জমি ও প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় উপস্থিত থেকে চারা রোপণের কৌশল বুঝিয়ে দিচ্ছেন। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকি করছেন।
চারা পুনঃস্থাপন নীতি: চুয়াডাঙ্গা খামারবাড়ির উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. মাসুদুর রহমান সরকার জানান, প্রাকৃতিক বা অন্য কোনো কারণে যদি কোনো কৃষকের চারা মারা যায়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে নতুন চারাগাছ এনে প্রতিস্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি চারাও যেন নষ্ট না হয়, সে ব্যাপারে আমরা কঠোর নজরদারি রাখছি।
জনমনে উদ্দীপনা ও কৃষকদের প্রতিক্রিয়া
প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সবুজ বিপ্লবের বার্তা সরাসরি পৌঁছে যাওয়ায় চুয়াডাঙ্গায় আনন্দমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিনামূল্যে মানসম্পন্ন চারা, সার ও খুঁটি পেয়ে কৃষকরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট।
চুয়াডাঙ্গা সদরের এক উপকারভোগী কৃষক উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলেন, আমরা খুব খুশি। শুধু চারা দেয়নি, সাথে গাছের গোড়ায় দেওয়ার জৈব সার ও খুঁটিও দিয়েছে। এতে আমাদের টাকা বেঁচে গেছে। এই উদ্যোগ দেখে আমরা নিজেরাও অনুপ্রাণিত। এখন নিজেদের খালি জায়গাতেও বাজার থেকে গাছ কিনে এনে রোপণ করব।
সমৃদ্ধ চুয়াডাঙ্গার অভিমুখে
উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. মাসুদুর রহমান সরকার ও অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিপি) মিঠু চন্দ্র অধিকারীর সঠিক দিকনির্দেশনা এবং উপজেলা পর্যায়ের ইউএনও ও কৃষি কর্মকর্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় চুয়াডাঙ্গার মাটিতে ২৫ হাজার নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। প্রশাসনিক সততা ও মাঠ পর্যায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণে বাস্তবায়িত এই উদ্যোগ চুয়াডাঙ্গাকে একটি সবুজ, সমৃদ্ধ ও পরিবেশবান্ধব জেলায় রূপান্তর করতে নতুন পথ দেখাচ্ছে।
এএন