অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
দেশের ভঙ্গুর প্রায় ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠন এবং জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে চলমান সংস্কার কার্যক্রম ব্যাহত হবে না বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনি এই আশ্বাস দেন। মূলত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকিং খাতে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা রক্ষাই এই বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য ছিল।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকার ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।
তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতের উন্নয়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে যে সংস্কারগুলো শুরু হয়েছে, সেগুলো কেবল অব্যাহতই থাকবে না, বরং আরও গতিশীল করা হবে। ‘আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর গত কয়েক মাসে গৃহীত সংস্কার উদ্যোগগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত খতিয়ান মন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এই কার্যক্রমগুলো চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুবই ইতিবাচক এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চমূল্যস্ফীতি। বৈঠকে গভর্নর জানিয়েছেন যে, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখাই সরকারের এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘টপ প্রায়োরিটি’।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতিকে আরও কঠোর করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমন্বয় করে কাজ করবে যাতে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়।
ব্যাংকিং খাতের বিষফোড়া হিসেবে পরিচিত খেলাপি ঋণ (NPL) নিয়ে বৈঠকে বিশদ আলোচনা হয়েছে। গভর্নর জানান, খেলাপি ঋণ কমাতে তিনটি প্রধান কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
১. বড় অংকের খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা আইনি কাঠামোর সংস্কার করা হবে।
২. যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ করছেন না, তাদের তালিকা তৈরি করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখা হতো (Window Dressing)।
৩. এখন থেকে প্রতিটি ব্যাংকের শ্রেণিকরণ প্রক্রিয়া হবে আন্তর্জাতিক মানের এবং স্বচ্ছ।
ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন উদ্যোগ হলো পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে (এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক) একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন।
ব্যাংকটির আর্থিক কাঠামো অনুমোদিত মূলধন ৪০,০০০ কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ৩৫,০০০ কোটি টাকা। সরকারি জোগান ২০,০০০ কোটি টাকা।
গভর্নর জানিয়েছেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে স্থিতিশীল করাই এখন বড় লক্ষ্য। তিনি আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন যে, পুরোনো গ্রাহকরা পর্যায়ক্রমে তাদের অর্থ ফেরত পাচ্ছেন এবং নতুন আমানতও আসতে শুরু করেছে, যা ব্যাংকটির প্রতি মানুষের আস্থা ফেরার লক্ষণ।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি হিসেবে মেধাতালিকায় শীর্ষে থাকা নাবিল মুস্তাফিজুর রহমান নিয়োগ পেলেও তিনি অসুস্থতার কারণে যোগদান করেননি। গভর্নর জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই নতুন এমডি খোঁজার কাজ শুরু হবে।
এমডি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান প্রশাসক ও পরিচালনা পর্ষদ সংস্কার কাজ চালিয়ে যাবে। প্রয়োজনে বোর্ডের মেয়াদ বাড়ানো বা আরও অভিজ্ঞ সদস্য নিয়োগের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, "আমরা নিয়মিত ব্যাংকারদের সাথে আলোচনা করছি। অধিকাংশ ব্যাংক মালিক ও কর্মকর্তা মনে করছেন যে সংস্কারের পদক্ষেপগুলো ইতিমধ্যে ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করেছে। অর্থনীতিতে যাতে ঋণের সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও গাইডলাইন দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থমন্ত্রী এবং গভর্নরের এই বৈঠকটি বাজারে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় বিনিয়োগে সরকারের সরাসরি অর্থায়ন এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে। তবে এমডি নিয়োগের মতো প্রশাসনিক কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করা না গেলে সংস্কারের গতি মন্থর হয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের এই সংস্কারকাল কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একার কাজ নয়, এতে রাজনৈতিক সদিচ্ছাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থমন্ত্রীর আশ্বাসের ফলে ড. আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আরও সাহসের সাথে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এএন