হাশেম রেজা
অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০২:২০ পিএম
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় আমাদের পরিবেশ, তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা ও বায়ুচাপ। এই পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরকেও মানিয়ে নিতে হয় নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে। কিন্তু অনেকের শরীর এ পরিবর্তনে দ্রুত সাড়া দিতে পারে না, ফলে দেখা দেয় নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা বিশেষ করে সর্দি, কাশি, জ্বর, গলা ব্যথা, অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্ট। আবহাওয়া পরিবর্তনের এই সময়ে রোগ-জীবাণুর প্রকোপও বেড়ে যায়, যা শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, অ্যাজমা রোগীদের জন্য বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ।
কেন আবহাওয়া পরিবর্তনে শরীর অসুস্থ হয়
মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) তাপমাত্রার ওঠানামার প্রতি সংবেদনশীল। হঠাৎ ঠান্ডা থেকে গরম, কিংবা গরম থেকে ঠান্ডায় পরিবর্তন হলে শরীরের ভেতরে তাপমাত্রা ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে ইমিউন রেসপন্স দুর্বল হয়ে পড়ে, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ সহজে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
ঢাকা বক্ষব্যাধির বিশেষজ্ঞ ডা. তাহমিনা রহমান বালেন, ঋতু পরিবর্তনের সময় বাতাসে ধুলাবালি, পরাগরেণু, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় থাকে। ফলে অ্যালার্জি, ঠান্ডা-কাশি এবং অ্যাজমা রোগীদের সমস্যা বেড়ে যায়।
তাছাড়া শুষ্ক বাতাসে নাক ও গলার শ্লেষ্মা শুকিয়ে যায়, যা জীবাণু প্রতিরোধে বাধা সৃষ্টি করে। ফলাফল, সর্দি, হাঁচি, কাশি, গলা ব্যথা, এমনকি ফুসফুসে সংক্রমণ পর্যন্ত।
সর্দি–কাশি ও ভাইরাল জ্বর
এ সময় সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হলো ভাইরাল ফ্লু। রাইনোভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ও করোনা ভাইরাসের বিভিন্ন রূপ বাতাসে সহজে ছড়ায়। ঠান্ডা বাতাসে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেলে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে জ্বর, গলা ব্যথা, মাথা ভার, কাশি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। পরামর্শ: হঠাৎ ঠান্ডা পানি না খাওয়া, বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার, ভিড় এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও গরম তরল পানীয় গ্রহণ করা।
শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমা
যাদের আগে থেকেই অ্যাজমা বা ক্রনিক শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে, তাদের জন্য ঋতু পরিবর্তন ভয়াবহ সময়। বাতাসের আর্দ্রতা, ধুলাবালি, পরাগরেণু বা ঠান্ডা বাতাস ফুসফুসে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে। এতে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বুকে চাপ লাগে, কাশি বেড়ে যায়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজিজেস অব দ্য চেস্ট অ্যান্ড হাসপাতাল (NIDCH) এর চিকিৎসক ডা. মুশফিকুর রহমান বলেন, শীত আসার আগে থেকেই অনেক অ্যাজমা রোগীর উপসর্গ দেখা দেয়। ইনহেলার ব্যবহার, ধুলাবালি থেকে দূরে থাকা এবং সঠিক ওষুধে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব জরুরি।
প্রতিরোধে করণীয়: ইনহেলার বা প্রেসক্রাইবড ওষুধ নিয়মিত ব্যবহার করা, ঘর পরিষ্কার ও ধুলামুক্ত রাখা, ধূমপান ও ধোঁয়াযুক্ত পরিবেশ এড়িয়ে চলা, ঠান্ডা বাতাসে বাইরে না যাওয়া।
অ্যালার্জি ও সাইনোসাইটিস
পরিবেশে ধুলা, ফুলের পরাগরেণু, ধোঁয়া বা ছত্রাকের বৃদ্ধি অ্যালার্জি বাড়িয়ে দেয়। এতে হাঁচি, নাক বন্ধ, চোখ চুলকানো ও মাথা ভার হয়। অনেক ক্ষেত্রে সাইনোসাইটিসেও রূপ নেয়, যেখানে মুখমণ্ডল ব্যথা, মাথা ধরা ও জ্বর দেখা দেয়।
চিকিৎসকের টিপস: নাক দিয়ে গরম পানি টানা (স্টিম ইনহেলেশন) উপকারী, পর্যাপ্ত পানি পান ও নাক পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজনে অ্যান্টিহিস্টামিন বা নাকের স্প্রে ব্যবহার, ত্বকের সমস্যা ও গা চুলকানো হয়।
আবহাওয়া শুষ্ক হলে ত্বক থেকে ঘাম ও তেলের নিঃসরণ কমে যায়। ফলে ত্বক রুক্ষ, খসখসে ও চুলকানিযুক্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ত্বকে এই সমস্যা বেশি দেখা দেয়।
যা করবেন: প্রতিদিন হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার, পর্যাপ্ত পানি পান, অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে গোসল না করা।
জ্বর ও দেহব্যথা
আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় ভাইরাল সংক্রমণের কারণে অনেকের জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথা ভার লাগা দেখা দেয়। সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়, তবে জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
শিশু ও বয়স্কদের জন্য সতর্কতা
শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল, আর বয়স্কদের রোগপ্রতিরোধ কমে যায় বয়সের কারণে। তাই এ দুই শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
শিশুদের জন্য করণীয়: ঠান্ডা পানি বা বরফজাতীয় খাবার না দেওয়া, বাইরে গেলে কান, গলা ঢেকে রাখা। পর্যাপ্ত ঘুম ও গরম স্যুপজাতীয় খাবার দেওয়া।
বয়স্কদের জন্য করণীয়: হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তন এড়িয়ে চলা, ওষুধ নিয়মিত খাওয়া, ধুলাবালি থেকে দূরে থাকা, শ্বাসকষ্ট বা জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
পুষ্টি ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সুষম খাদ্যগ্রহণ।
যে খাবারগুলো উপকারী: ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ ফল (কমলা, লেবু, পেয়ারা), দুধ, ডিম, মাছ, শাকসবজি, আদা, মধু ও লবঙ্গ–যা গলা ও শ্বাসতন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়,পর্যাপ্ত পানি পান (প্রতিদিন কমপক্ষে ৮ গ্লাস)।
অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত বা ঠান্ডা খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।
জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যবিধি
আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় কিছু সহজ অভ্যাস আপনাকে অনেক সমস্যার হাত থেকে বাঁচাতে পারে, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিন, প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম করুন, মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন, হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন,হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তন (গরম থেকে ঠান্ডা বা উল্টো) এড়িয়ে চলুন।
কবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন
যদি দেখা দেয়- শ্বাস নিতে কষ্ট, বুকে চাপ, তিন দিনের বেশি জ্বর, রক্তসহ কাশি বা তীব্র গলা ব্যথা, শিশু বা বৃদ্ধের অচেতনতা বা খাওয়ার অনীহা, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বিপজ্জনক, কারণ ভাইরাল সংক্রমণে এসব ওষুধ কার্যকর নয়, বরং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটায়।
প্রকৃতি তার নিয়মে বদলায়, কিন্তু মানুষের শরীর সবসময় সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। তাই সচেতনতা, স্বাস্থ্যবিধি মানা ও সঠিক জীবনযাপনই হতে পারে সর্বোত্তম প্রতিরোধ।
প্রতিরোধ চিকিৎসার চেয়ে উত্তম- এই প্রবাদটিই এ সময় সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। নিজের শরীর ও পরিবারের সবার যত্ন নিন, আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে চলুন, তাহলেই এই মৌসুমের রোগ–বালাই থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
জেএইচআর