ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাট: মানবস্বাস্থ্যের এক নীরব ঘাতক

ড. মোহাম্মদ শোয়েব

ড. মোহাম্মদ শোয়েব

এপ্রিল ২০, ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম

খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাট: মানবস্বাস্থ্যের এক নীরব ঘাতক

চর্বি আমাদের খাদ্যের একটি অপরিহার্য উপাদান, তবে সব ধরনের চর্বি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী নয়। চর্বি প্রধানত ট্রাইগ্লিসারাইড আকারে থাকে, যা ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল দিয়ে গঠিত। ফ্যাটি অ্যাসিড হলো দীর্ঘ শৃঙ্খলবিশিষ্ট অ্যালিফ্যাটিক কার্বক্সিলিক অ্যাসিড, যা সম্পৃক্ত এবং অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড উভয় রূপে বিদ্যমান।

কোনো ফ্যাটি অ্যাসিডে যদি একটি মাত্র ডাবল বন্ড থাকে, তবে তাকে মনো-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড বলা হয়। আর একাধিক ডাবল বন্ড থাকলে তাকে পলি-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড বলা হয়। অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডে সিস বা ট্রান্স কনফিগারেশন থাকতে পারে। অলিক অ্যাসিড, লিনোলিক অ্যাসিড এবং লিনোলেনিক অ্যাসিড সিস কনফিগারেশনের অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

ইউরোপিয়ান ফুড সেফটি অথরিটি (ইফসা) অনুযায়ী, ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড (ট্রান্স ফ্যাট) হলো এমন অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, যাতে অন্তত একটি ডাবল বন্ড ট্রান্স কনফিগারেশনে থাকে। এলাইডিক অ্যাসিড এবং ভ্যাক্সেনিক অ্যাসিড ট্রান্স ফ্যাটের উদাহরণ।

প্রাকৃতিকভাবে গরু, ছাগল ও ভেড়ার মতো জাবরকাটা প্রাণীর চর্বিতে অল্প পরিমাণ ট্রান্স ফ্যাট থাকে, যা তাদের পাকস্থলীর ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে উৎপন্ন হয়। মাংস, দুধ, মাখন, চিজ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে স্বল্প পরিমাণ ট্রান্স ফ্যাট বিদ্যমান। বাংলাদেশে রাস্তার ভাজাপোড়া খাবারের অতিরিক্ত গ্রহণ এবং একই তেল বারবার ব্যবহার (পোড়া তেল) করার কারণে মানবদেহে ট্রান্স ফ্যাটের ঝুঁকি বাড়ে।

শিল্পজাত বা কৃত্রিম ট্রান্স ফ্যাট ভোজ্য তেল যেমন সয়াবিন, পাম, তুলাবীজ ও ক্যানোলা তেল প্রক্রিয়াজাত করার সময় তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তেল গরম করলেও ট্রান্স ফ্যাট তৈরি হতে পারে। আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল (পিএইচও) তৈরির সময় হাইড্রোজেনেশন প্রক্রিয়ায় এই ট্রান্স ফ্যাট সৃষ্টি হয়, যেখানে তরল উদ্ভিজ্জ তেলকে হাইড্রোজেন গ্যাস ও ধাতব অনুঘটকের (সাধারণত নিকেল) উপস্থিতিতে গরম করা হয়।

এতে তেল তরল থেকে কঠিন বা আধা-কঠিনে রূপান্তরিত হয়, যা খাবারের গঠন, সংরক্ষণক্ষমতা ও উচ্চ তাপে রান্নার উপযোগিতা বাড়ায় এবং উৎপাদন খরচ কমায়। ডালডা, মার্জারিন, মাখন, বেকারি পণ্য (কেক, বিস্কুট, পেস্ট্রি), ফাস্ট ফুড এবং প্যাকেটজাত স্ন্যাকসে এ ধরনের তেল ব্যবহৃত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সুপারিশ করে যে, একজন প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক মোট শক্তির ১% এর কম ট্রান্স ফ্যাট থেকে আসা উচিত, যা ২০০০ ক্যালরির খাদ্যতালিকায় প্রায় ২.২ গ্রাম বা তার কম। WHO আরও সুপারিশ করে যে, সব খাদ্যে শিল্পজাত ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ প্রতি ১০০ গ্রাম ফ্যাটে সর্বোচ্চ ২ গ্রাম সীমার মধ্যে রাখতে হবে।

হৃদরোগ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রধান কারণ। প্রতিবছর প্রায় ২,৭৮,০০০ মানুষের মৃত্যু শিল্পজাত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের কারণে ঘটে। ট্রান্স ফ্যাট রক্তনালীতে জমে গিয়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। ১৯৫৬ সাল থেকেই ট্রান্স ফ্যাট নিয়ে বৈজ্ঞানিক উদ্বেগ শুরু হয়। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমান করা হয়, ট্রান্স ফ্যাটের কারণে বছরে অন্তত ৩০,০০০ মানুষের মৃত্যু ঘটে।

গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৫৯ জন হৃদরোগে মারা যায় এবং এদের মধ্যে প্রায় ৪% মৃত্যুর সঙ্গে ট্রান্স ফ্যাট ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ট্রান্স ফ্যাট শরীরে প্রবেশ করলে লিপোপ্রোটিনের মাধ্যমে রক্তে পরিবাহিত হয়। এটি কম ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন (এলডিএল; LDL; খারাপ কোলেস্টেরল) বাড়ায় এবং উচ্চ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন (এইচডিএল; HDL; ভালো কোলেস্টেরল) কমায়, ফলে ধমনীতে প্রদাহ ও শক্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

এতে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ এলডিএল/এইচডিএল অনুপাত বাড়ায়, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এছাড়া ট্রান্স ফ্যাট স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, বন্ধ্যাত্ব, আলঝেইমারস এবং কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকির সাথেও সম্পর্কিত।

খাদ্যে আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল (পিএইচও) কমালে দ্রুত স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া যায়, যেমন প্রদাহ কমে, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে আসে এবং হৃদরোগ ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি কমে। এ কারণে বিশ্বজুড়ে অনেক দেশ ট্রান্স ফ্যাট নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন করেছে। WHO-এর তথ্য মতে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৫৩টি দেশ ট্রান্স ফ্যাট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ করেছে।

২০০৩ সালে ডেনমার্ক প্রথম কঠোর আইন প্রণয়ন করে, যেখানে ফ্যাটে ট্রান্স ফ্যাটের সীমা ২% নির্ধারণ করা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ খাদ্যের লেবেলে ট্রান্স ফ্যাট উল্লেখ বাধ্যতামূলক করে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ২০২১ সালে “খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা” প্রণয়ন করে, যা ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ থেকে কার্যকর হয়। এই বিধিমালায় ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা ২% নির্ধারণ করা হয়েছে (প্রাকৃতিক ট্রান্স ফ্যাট বাদে)। সব ধরনের প্রক্রিয়াজাত, প্যাকেটজাত এবং প্রস্তুত খাবারে এই নিয়ম প্রযোজ্য। খাদ্যের লেবেলে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ উল্লেখ বাধ্যতামূলক, তবে “ট্রান্স ফ্যাটমুক্ত” বা “শূন্য” দাবি করা যাবে না।

২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ১১টি সয়াবিন তেল, ৯৫টি ডালডা, ৩০টি বাটার এবং ১৪টি মার্জারিনের নমুনা সংগ্রহ করে নির্ধারিত পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করেছে।

এসব নমুনার মধ্যে ৭টি সয়াবিন তেল (৬৩%), ৯৩টি ডালডা (৯৭%), ২৬টি বাটার (৮৬%) এবং ৬টি মার্জারিন (৪২%) নমুনায় অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া গেছে। এছাড়া হোটেল ও রেস্টুরেন্টে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অভিযান ও তাৎক্ষণিক তেল পরীক্ষায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিয়ম ধরা পড়ে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।

তবে মনিটরিং ও বিভিন্ন অভিযান কার্যক্রমের সময় বিএফএসএ-এর কর্মকর্তাগণ হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে পোড়া তেল সংগ্রহ করে এবং বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে যেমন—ক্যাম্পেইন, বাল্ক এসএমএস, পোস্টার ও টিভি স্ক্রলিং বার্তার মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে মানবস্বাস্থ্যে পোড়া তেল ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে থাকেন।

তারা দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা এবং বারবার ভোজ্য তেল ব্যবহার (পোড়া তেল ব্যবহার) থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে পরামর্শ প্রদান করেন।

খাদ্য পণ্যে ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিডের উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন, অ্যাসোসিয়েশন অব অফিসিয়াল অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্টস, আমেরিকান অয়েল কেমিস্টস’ সোসাইটি এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেইরি ফেডারেশন অনুমোদিত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তবে বাংলাদেশে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেমন—পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধার অভাব, প্রশিক্ষিত জনবলের স্বল্পতা, রাসায়নিক উপকরণের অভাব এবং জনসচেতনতার ঘাটতি।

বাংলাদেশে ট্রান্স ফ্যাট নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার কৌশল:

 

  • ভোজ্য তেল পরিশোধন কারখানায় নিয়মিত নজরদারি;
  • সয়াবিন তেল, মার্জারিন ও ডালডা শিল্পে ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে কঠোর পর্যবেক্ষণ গ্রহণ;
  • একই তেল রান্নায় বারবার (পোড়া তেল) ব্যবহার না করা;
  • নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও রান্নার পদ্ধতি প্রচার করা।

সার্বিকভাবে, ট্রান্স ফ্যাট একটি প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি। এটি কমাতে সরকার, শিল্পখাত এবং ভোক্তাদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।

ভোক্তারা সচেতনভাবে ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খেলে এবং খাদ্যের লেবেল দেখে নির্বাচন করলে ট্রান্স ফ্যাটের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ট্রান্স ফ্যাট কমিয়ে হৃদরোগসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগের বোঝা কমানো সম্ভব।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব
সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন)
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ

Link copied!