আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মে ৩, ২০২৬, ১০:৫৩ এএম
জার্মানি থেকে ৫,০০০ মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে প্রত্যাশিত বলে অভিহিত করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এই পদক্ষেপের ফলে ন্যাটো সামরিক জোটের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং তারা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে।
শনিবার রাতে সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, আমরা সংখ্যাটি অনেক কমিয়ে আনব এবং ৫,০০০-এর চেয়েও অনেক বেশি সৈন্য কমানো হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে তিনি আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে এল যখন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। চলমান ইরান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে অপদস্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন মের্জ।
গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে আলাপকালে মের্জ বলেন, আমেরিকানদের স্পষ্টতই কোনো কৌশল নেই। ইরানিরা আলোচনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ, অথবা বলা ভালো যে তারা আলোচনা না করার ক্ষেত্রে দক্ষ। তারা আমেরিকানদের ইসলামাবাদ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাচ্ছে এবং কোনো ফলাফল ছাড়াই তাদের বিদায় করে দিচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন যে, পুরো জাতি ইরানের কাছে অপদস্থ হচ্ছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেন যে, মের্জ মনে করেন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা ঠিক আছে এবং তিনি কী বলছেন তা তিনি নিজেই জানেন না। এর কিছুকাল পরেই মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে।
বর্তমানে জার্মানিতে ৩৬,০০০-এরও বেশি সক্রিয় মার্কিন সৈন্য রয়েছে, যা ইউরোপের মধ্যে যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ। তুলনামূলকভাবে ইতালিতে রয়েছে ১২,০০০ এবং যুক্তরাজ্যে ১০,০০০ সৈন্য। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল জানিয়েছেন যে, প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের নির্দেশে এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়া আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে।
ট্রাম্প শুধু জার্মানি নয়, ইতালি এবং স্পেন থেকেও সৈন্য প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত বছর রোমানিয়া থেকেও সৈন্য কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ওয়াশিংটন, যার লক্ষ্য ছিল মার্কিন সামরিক মনোযোগ ইউরোপ থেকে সরিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ৩২ সদস্যের ন্যাটো জোটের মধ্যে ফাটল ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জোটের মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট জানিয়েছেন যে, তারা এই সিদ্ধান্তের খুঁটিনাটি বুঝতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কাজ করছেন।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক শনিবার এক হুঁশিয়ারিতে বলেন, ট্রারান্সঅটলান্টিক সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি এর বাইরের শত্রুরা নয়, বরং আমাদের জোটের চলমান ভাঙন। এই বিপর্যয়কর প্রবণতা রুখতে আমাদের সবাইকে যা করা প্রয়োজন তা করতে হবে।
এমনকি ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির দুই জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা, সিনেটর রজার উইকার এবং প্রতিনিধি মাইক রজার্স, জার্মানি থেকে একটি ব্রিগেড প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে "গভীর উদ্বেগ" প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, ইউরোপে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখা মার্কিন স্বার্থেই প্রয়োজন।
জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস জানিয়েছেন যে, ইউরোপকে এখন নিজের নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে এবং বার্লিন ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ইউরোপে মার্কিন সৈন্যদের উপস্থিতি জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্র, উভয় পক্ষের স্বার্থেই জরুরি।
ট্রাম্প দীর্ঘকাল ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন যে, জার্মানি তার জিডিপি-র ২% প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় না করে "ফাঁকিবাজি" করছে। তবে মের্জ সরকারের অধীনে এই চিত্র বদলেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয় ১০৫.৮ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউক্রেনকে দেওয়া সহায়তা সহ বর্তমানে জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপি-র ৩.১% এ দাঁড়িয়েছে।
ন্যাটো মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট বলেন, গত বছর হেগ সম্মেলনে মিত্র দেশগুলো তাদের জিডিপি-র ৫% প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ করতে সম্মত হওয়ার পর থেকে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।
ন্যাটোর কড়া সমালোচক ট্রাম্প মূলত মিত্র দেশগুলোর ওপর ক্ষুব্ধ কারণ তারা হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ তেলবাহী সমুদ্রপথের ট্রাফিক মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলের ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে হোয়াইট হাউসে ফ্রিডরিখ মের্জ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের শেষ সাক্ষাতের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের যে অবনতি শুরু হয়েছে, এই সেনা প্রত্যাহার তাকে আরও জটিল করে তুলল। ইউরোপের নিরাপত্তা এখন এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে দেশগুলোকে নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মার্কিন নির্ভরতা কমানোর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এএন