আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মে ২৩, ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম
ইউক্রেনের অধিকৃত পূর্বাঞ্চলীয় একটি শহরের ছাত্রাবাসে প্রাণঘাতী ড্রোন হামলা চালানোর জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেছে রাশিয়া। এই ঘটনার পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রাশিয়ার দাবি, এই হামলায় বেশ কয়েকজন বেসামরিক শিক্ষার্থী হতাহত হয়েছেন, যার বিপরীতে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের জন্য ইতিমধ্যে রুশ বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মস্কোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের ছিটমহল হিসেবে পরিচিত লুহানস্ক অঞ্চলের স্টারোবিলস্ক ' শহরে গত রাতে এই ভয়াবহ ড্রোন হামলাটি চালানো হয়। এতে অন্তত ৬ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অন্তত ১৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে রুশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পুতিনের ক্ষোভ ও ক্রেমলিনের প্রতিক্রিয়া
শুক্রবার মস্কোয় নিজের ক্রেমলিন বাসভবনে আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি এই আক্রমণকে একটি 'সরাসরি বেসামরিক স্থাপনায় হামলা' হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইউক্রেনীয় বাহিনীর এই কর্মকাণ্ডের জবাবে রুশ সামরিক বাহিনীকে উপযুক্ত এবং কঠোর 'প্রতিশোধমূলক প্রস্তাব' বা পরিকল্পনা প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
পুতিন তার বক্তব্যে দাবি করেন, হামলার শিকার হওয়া ভবনটির আশেপাশে কোনো সামরিক ঘাঁটি বা গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয় ছিল না।
তিনি বলেন, 'যেখানে হামলা চালানো হয়েছে, তার আশেপাশে কোনো সামরিক স্থাপনা বা গোয়েন্দা বিভাগের কোনো শাখা ছিল না। তাই আমাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা 'বা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেমের বাধার কারণে ভুলবশত ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনটি ওই ভবনে আছড়ে পড়েছে- এমন দাবি করার কোনো ভিত্তি নেই। ইউক্রেন জেনেশুনেই এই বেসামরিক ছাত্রাবাসকে নিশানা করেছে।
রুশ প্রেসিডেন্টের মতে, ইউক্রেনীয় বাহিনী মোট তিনটি ধাপে '১৬টি ড্রোন ব্যবহার করে এই সুপরিকল্পিত হামলাটি পরিচালনা করেছে।
হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে এই হামলার শিকার হওয়া আহতদের কয়েকজনকে দেখানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে ডায়ানা শভকুন ' নামের ১৯ বছর বয়সী এক আহত ছাত্রীকে হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার সময় ছাদের একটি কংক্রিটের স্ল্যাব ভেঙে মাথায় পড়ার কারণে তিনি গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।
তবে মস্কো যে ৬ জন নিহতের দাবি করেছে, তাদের কোনো ছবি বা ভিডিও এখন পর্যন্ত রুশ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। ধসে পড়া ভবনের নিচে এখনও উদ্ধার অভিযান চলছে এবং নিখোঁজ ১৫ জনের সন্ধানে তৎপরতা জারি রেখেছে স্থানীয় জরুরি বিভাগ।
ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর পাল্টা দাবি
রাশিয়ার এই গুরুতর অভিযোগের বিপরীতে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। কিয়েভের দাবি, তাদের নিখুঁত ড্রোন হামলাটি কোনো ছাত্রাবাসে ছিল না, বরং সেটি ছিল রাশিয়ার বিশেষায়িত এলিট ড্রোন ইউনিট 'রুবিকন' এর সদর দফতর। ইউক্রেনের দাবি অনুযায়ী, স্টারোবিলস্ক শহরে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি থেকেই ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নিয়মিত ড্রোন হামলা পরিচালনা করা হতো।
তবে ইউক্রেনীয় বাহিনী এটি স্পষ্ট করেনি যে, রাশিয়া যে ভবনটিকে ছাত্রাবাস বলে দাবি করছে, সেটি এবং তাদের দাবি করা রুবিকন ইউনিটের সদর দফতর একই ভবন কি না।
কিয়েভের সামরিক সদর দফতর থেকে বলা হয়েছে, ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনী আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, যুদ্ধের নিয়ম এবং রীতিনীতি কঠোরভাবে মেনে চলে। আমরা কেবল রাশিয়ার সামরিক অবকাঠামো এবং সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত স্থাপনাগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছি।
নভোরোসিস্ক ও আনাপায় নতুন ড্রোন হামলা
স্টারোবিলস্কের ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরেই, শনিবার ভোরের দিকে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী নভোরোসিস্ক এ নতুন করে ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেন। ক্রাসনোদার অঞ্চলের দক্ষিণাঞ্চলীয় সাধারণ সদর দফতর জানিয়েছে, ইউক্রেনীয় ড্রোন লক্ষ্য করে গুলি করার পর সেটির ধ্বংসাবশেষ একটি তেল শোধনাগারে গিয়ে পড়ে এবং সেখানে বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।
আঞ্চলিক প্রশাসনের তথ্যমতে, ড্রোনের আঘাতে জ্বালানি টার্মিনাল এবং বেশ কয়েকটি প্রযুক্তিগত প্রশাসনিক ভবনে আগুন ধরে যায়। এই ঘটনায় দুইজন ব্যক্তি আহত হয়েছেন এবং তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে এখানে কোনো নিহতের খবর পাওয়া যায়নি। এছাড়া এর কিছুটা উত্তরে অবস্থিত আনাপা নামক অপর একটি বন্দর নগরীতেও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বেশ কিছু ব্যক্তিগত বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রুশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
খেরসনে এফএসবির সদর দফতরে হামলা ও শতধিক রুশ সেনা হতাহত
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলে (যা বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে) রাশিয়ার কুখ্যাত অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা 'এফএসবি এর একটি আঞ্চলিক সদর দফতরে' বড় ধরনের হামলা চালায় ইউক্রেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নিজেই এই সফল অভিযানের কথা নিশ্চিত করে জানান, ওই হামলায় প্রায় ১০০ জন রুশ 'দখলদার' সেনা ও কর্মকর্তা নিহত অথবা গুরুতর আহত হয়েছেন। মস্কোর সামরিক বাহিনী এই সুনির্দিষ্ট হামলার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও, ক্রেমলিন-পন্থী বেশ কয়েকটি টেলিগ্রাম চ্যানেল স্বীকার করেছে যে, একটি 'ব্যাপক ড্রোন হামলায়' তাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
চলমান যুদ্ধের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকেই দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ এনে আসছে। ইউক্রেন বারবার দাবি করেছে যে, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের আবাসিক ভবন, হাসপাতাল এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যুদ্ধাপরাধ করছে, যা মস্কো বরাবরই অস্বীকার করে একে 'সামরিক লক্ষ্যবস্তু" হিসেবে দাবি করে।
ঠিক গত সপ্তাহেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার একটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি বহুতল আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ওই ঘটনায় তিন শিশুসহ মোট ২৪ জন ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়া যখন প্রতিনিয়ত তাদের সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে, তখন ইউক্রেন কেবল রাশিয়ার মূল সামরিক শক্তি ও রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্য পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির শঙ্কা
লুহানস্কের এই ছাত্রাবাসে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুতিনের 'প্রতিশোধের' হুঁশিয়ারি চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও বেশি সংঘাতময় করে তুলতে পারে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকেরা। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ প্রধান প্রধান শহরগুলোতে রাশিয়া আগামী দিনগুলোতে আরও বড় ধরনের বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে- এমন আশঙ্কায় ইউক্রেনজুড়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
এএন