বিশেষ প্রতিবেদক
আগস্ট ২৪, ২০২৫, ১০:৫৩ পিএম
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, দেশের কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের একাংশের ক্ষমতার অপব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। তাদের এমন আচরণ কর্তৃত্ববাদের পতনে সৃষ্ট নতুন বন্দোবস্তের জন্য অশনি সংকেত।
রোববার টিআইবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কর্তৃত্ববাদ পতনের পরিপ্রেক্ষিতে গত এক বছরে সবচেয়ে প্রভাবশালী বলে বিবেচিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের একাংশের কার্যক্রম আগের আমলের সরকারি দলের বহুমুখী ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বার্থসিদ্ধিমূলক অসুস্থ চর্চার প্রতিচ্ছবি।
বলেন, কর্তৃত্ববাদের পতনের পর থেকেই দেশব্যাপী বহুমাত্রিক দলবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট, মামলা বাণিজ্য, গ্রেপ্তার বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য, ট্যাগ বাণিজ্য ও দলীয় আধিপত্য কেন্দ্রিক সহিংসতা শুরু হয়েছে। যা ‘নতুন বাংলাদেশে’ বা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের জন্য অশনি সংকেত। এতে বলা হয়, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিমূলক চর্চা প্রতিষ্ঠায় করণীয় নিয়ে আত্মজিজ্ঞাসার এখনই সময়।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মুখে সংস্কারের কথা বললেও আধিপত্য, দখল ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি অব্যাহত থাকায় ‘নতুন বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার জনআকাঙ্ক্ষা পদদলিত হচ্ছে। কর্তৃত্ববাদের পতনে মৌলিক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হলেও ‘এবার আমাদের পালা’ এমন মানসিকতা সুস্থ রাজনৈতিক বিকাশের সম্ভাবনার পথে আত্মঘাতী প্রতিরোধ সৃষ্টি করছে।
নির্বাহী পরিচালক বলেন, ক্ষমতা-প্রত্যাশী ও প্রভাবশালী দলগুলোর নেতাকর্মীদের একাংশের সরাসরি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারস্পরিক যোগসাজশমূলক সম্পৃক্ততায় দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আবারও স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পতিত রাজনৈতিক শক্তিও যুক্ত থাকছে। প্রথাগত দলবাজি, দখলবাজি ও পদ বাণিজ্যের কারণে সহিংস দলীয় কোন্দল স্থানীয় পর্যায়ে হরতাল ঘোষণার মতো বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে দেখা গেছে। টিআইবির ভাষ্যমতে, দাবি আদায়ে বলপ্রয়োগের পাশাপাশি কোনো কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও বিচ্ছিন্নভাবে অতিক্ষমতায়িত শক্তির সম্পৃক্ততায় তথাকথিত ‘মবতন্ত্রের’ মুখোশে সংখ্যালঘু, জেন্ডারভিত্তিক, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণ, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের বিরুদ্ধে বীভৎস আঘাত, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ওপর নির্মম আক্রমণের অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে হয়েছে দেশবাসীকে।
সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের একাংশের দায়িত্বহীনতা, স্বার্থসিদ্ধির জন্য উঠেপড়ে লাগা, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উদ্বেগজনক ঘাটতির কথা উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যদিও সংশ্লিষ্ট দলগুলোর উচ্চপর্যায় থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাবধান করা থেকে শুরু করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংগঠনিক পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এসবের কার্যকর প্রতিকারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসন বরাবরের মতো ব্যর্থতার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে সহায়কের ভূমিকা পালন করছে। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিরোধ ও সংশোধনমূলক কৌশল নিতে দেখা যাচ্ছে না।
টিআইবি বলেছে, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেকেই দখলদারি, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে লিপ্ত হয়েছেন এবং প্রতিনিয়ত তার মাত্রা বাড়ছে। ‘এবার আমাদের পালা’—এই সংস্কৃতির চর্চায় লিপ্ত হয়ে দলগুলোর পাশাপাশি সরকার, প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অংশীদারত্বের দৃষ্টান্ত পুনরুজ্জীবিত করেছেন। পরিবহন টার্মিনাল, খনিজ সম্পদ, সেতু, বাজার ও জলমহাল দখল ও চাঁদাবাজির চক্রের পুনরুত্থানও রাজনৈতিক অঙ্গনে অতীতের কর্তৃত্ববাদী শাসনের দুঃশাসনের ধারাবাহিকতাকে জিইয়ে রাখছে।
সংস্থাটি বলছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে সৃষ্ট নতুন দল সুশাসন, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বাস্তবে তাদের নেতাকর্মীর একাংশও চাঁদাবাজিসহ নানাবিধ অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে স্বার্থান্বেষী ও দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক চর্চাকেই রোল মডেল গ্রহণের আত্মঘাতী পথ বেছে নিয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ পুরোনো অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির হাতে ক্রমাগত জিম্মি দশায় পতিত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলো দেশবাসীকে কী এই বার্তাই দিচ্ছে যে, যদিও তারা সংঘবদ্ধ হয়ে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন সম্ভব করেছে, কর্তৃত্ববাদী চর্চার অবসানে তাদের আগ্রহ নেই বরং এই চর্চা লালন করাই তাদের লক্ষ্য?
এখনই রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মজিজ্ঞাসার সময় উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আত্মঘাতী রাজনৈতিক চর্চা পরিহার করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল চেতনা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা, জবাবদিহি, সততা ও নৈতিকতার কার্যক্রমের বিকাশের মাধ্যমে জনমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
ড. ইফতেখারুজ্জামান হুঁশিয়ার করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি, নৈতিক চর্চা ও গণতান্ত্রিক পরিচালন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনে শহীদ, আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের তথা আপামর জনগণের হতাশা বাড়বে। নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে এখনই দরকার রাজনৈতিক দলের গঠনমূলক আত্মজিজ্ঞাসাভিত্তিক মৌলিক পরিবর্তনের পথ অনুসন্ধান করা। পাশাপাশি পারস্পরিক সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি থেকে সরে আসার পথ বের করা। অন্যথায় নতুন বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে পতিত কর্তৃত্ববাদের পার্থক্য খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
ইএইচ