হাশেম রেজা
নভেম্বর ৬, ২০২৫, ০৫:০২ পিএম
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি অনন্য এবং ঐতিহাসিক দিন। এদিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস নামে পরিচিত- যেদিন দেশের সেনা সদস্য এবং সাধারণ জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে এক ঐতিহাসিক আন্দোলন গড়ে তোলে, যার ফলশ্রুতিতে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান এবং জাতীয় জীবনে এক নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা ঘটে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে কেবল একটি সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে দেখা যায় না; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার এক সমাপ্তি, একটি জাতির পুনর্জাগরণের মুহূর্ত। এই দিনে সেনা ও জনতা মিলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, স্বাধীনতার চেতনা ও জাতীয় সংহতির পক্ষে এক অভিন্ন অবস্থান তৈরি করে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর জাতির সামনে ছিল এক বিশাল পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্নির্মাণের পথে নানা অন্তর্দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক অনৈক্য ও প্রশাসনিক অদক্ষতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, একদলীয় ‘বাকশাল’ শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা-এসব মিলে রাষ্ট্রব্যবস্থা ক্রমেই অসন্তোষের দিকে গড়ায়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশ প্রবেশ করে গভীর রাজনৈতিক সংকটে। রাষ্ট্রনেতৃত্বে আসে খন্দকার মোশতাক আহমদ, যার প্রশাসন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
এরপর ৩ নভেম্বর ঘটে আরেক হূদয়বিদারক ঘটনা—কারাগারে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের চার শীর্ষ নেতা : সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে। এই হত্যাকাণ্ড জাতিকে হতবাক করে দেয়। সেনাবাহিনীর ভেতরে, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ অফিসারদের মধ্যে ক্ষোভ, বিভক্তি ও অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে।
এই রাজনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েনের ভেতর ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা গ্রহণ করেন, প্রেসিডেন্ট মোশতাককে সরিয়ে দেন এবং জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন। তবে সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ ও সাধারণ জনতা এই পরিস্থিতিকে মেনে নিতে পারেনি।
৭ নভেম্বরের বিপ্লব : এই পরিস্থিতিতেই আসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। ইতিহাসে যেটি পরিচিত “সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ বা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস” নামে।
সেদিন সকালে শুরু হয় সেনানিবাস ও রাজপথে বিক্ষোভ। সৈনিকদের মুখে মুখে তখন একটি স্লোগান—সৈনিক-জনতার ঐক্য, অটুট থাকুক। এই স্লোগান কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি ছিল জাতীয় চেতনার প্রতিফলন, এক নতুন সংহতির অঙ্গীকার।
সেনা সদস্যরা ও সাধারণ মানুষ একত্রে জেনারেল জিয়াউর রহমানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে নামে। শৃঙ্খলা ও সংহতির আহ্বানে সাড়া দিয়ে জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। সামরিক ও বেসামরিক জনগণের এই সম্মিলিত উদ্যোগেই বন্দি জেনারেল জিয়াউর রহমান মুক্তি পান এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য এক নতুন মোড় নেয়।
এই বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে সামরিক বিভাজন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে। সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার এক নতুন ধারা শুরু হয়।
বিপ্লবের তাৎপর্য : ৭ নভেম্বরের বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। এর মূল তাৎপর্য তিনটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট—
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা : দেশ ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত যে অরাজকতা, হত্যা, পাল্টা অভ্যুত্থান ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তা থেকে জাতি মুক্তি পায়।
জাতীয় সংহতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা : সৈনিক ও সাধারণ জনগণের ঐক্য রাষ্ট্রে এক নতুন সংহতি গড়ে তোলে।
গণতন্ত্রের পুনরারম্ভ : এই বিপ্লবের ফলেই জেনারেল জিয়াউর রহমান পরবর্তীতে গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, বহুদলীয় রাজনীতি চালু এবং জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। এই বিপ্লব তাই কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়-এটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনায় এক মৌলিক পুনর্গঠন।
জিয়াউর রহমান ও জাতীয় রাজনীতির পুনর্নির্মাণ: ৭ নভেম্বরের পরবর্তী সময়েই জেনারেল জিয়াউর রহমান দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণা আত্মপ্রকাশ করে-যা ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ থেকে ভিন্ন এক নতুন রাজনৈতিক দর্শন।
তিনি দেশের উন্নয়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, গ্রামীণ উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গঠনের উদ্যোগ নেন। তার নেতৃত্বেই বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন ঘটে, সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক দলের স্বাধীনতা ফিরে আসে। জিয়াউর রহমানের এই প্রচেষ্টার মূল ভিত্তিই ছিল ৭ নভেম্বরের জাতীয় সংহতির চেতনা- যেখানে সেনা ও জনতার ঐক্য রাষ্ট্রগঠনের শক্তিতে রূপ নেয়।
দিনটির গুরুত্ব : জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য কেবল ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আজও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও সমমনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলগুলো এই দিনটিকে রাষ্ট্রীয় ছুটি ও জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করত। সরকারি কর্মসূচি, র্যালি, আলোচনাসভা ও দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে এই দিবস পালন করা হতো। এই দিনটি মনে করিয়ে দেয়-সামরিক ও বেসামরিক জনগণের ঐক্যই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও গণতন্ত্রের ভিত্তি।
৭ নভেম্বরের বিপ্লব তাই ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ নামেই পরিচিত-যেখানে জাতি পুনরায় স্বাধীনতার মূল চেতনায় ফিরে আসে।
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও বিতর্ক : যদিও ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ঘিরে আজও নানা বিতর্ক আছে— কেউ বলেন এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা, কেউ বলেন এটি সামরিক ক্ষমতার পুনর্গঠন- তবে ইতিহাসবিদরা একমত যে, এই দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো ঘটনা।
রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে দাঁড়িয়ে এই দিনটির ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করলে দেখা যায়—এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। যদি ৭ নভেম্বরের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন না ঘটত, তবে রাষ্ট্র হয়তো আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হতো।
জাতীয় সংহতির শিক্ষা : ৭ নভেম্বরের মূল শিক্ষা হলো সংহতি ও ঐক্যই জাতির শক্তি। রাজনৈতিক বিভক্তি, অর্থনৈতিক বৈষম্য কিংবা মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব-এসব অতিক্রম করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।
সেই সংহতি যদি হারিয়ে যায়, তাহলে স্বাধীনতার অর্জনও ঝুঁকিতে পড়ে। তাই জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
আজকের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা : বর্তমান বাংলাদেশেও রাজনৈতিক বিভাজন, অবিশ্বাস ও সংঘাতের যে পরিস্থিতি দেখা যায়, সেখানে ৭ নভেম্বরের বার্তাটি আজও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনটি আমাদের শেখায়-সংঘাত নয়, সংহতি; প্রতিশোধ নয়, সহমর্মিতা; বিভাজন নয়, ঐক্য-এগুলোই জাতি গঠনের মূল চাবিকাঠি।
যে চেতনায় সেদিন সৈনিক ও জনতা একসাথে হয়েছিল, আজ সেই চেতনা পুনরুজ্জীবিত হওয়াই সময়ের দাবি। জাতির স্থিতি, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের গভীরতা নির্ভর করে সেই ঐক্যের ধারাবাহিকতার ওপর।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি দিন নয়- এটি জাতীয় আত্মচেতনার প্রতীক। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জাতি প্রমাণ করেছিল, ঐক্যবদ্ধ ইচ্ছাশক্তিই পারে অরাজকতা ও সংকট থেকে মুক্তি দিতে।
এই দিবসে, আমাদের পুনরায় সেই সংহতির আদর্শে ফিরে যেতে হবে— যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ নয়, জাতীয় স্বার্থ হবে প্রধান; যেখানে মতের ভিন্নতা বিভাজন নয়; বরং সমৃদ্ধির শক্তি হবে; এবং যেখানে গণতন্ত্রের ভিত্তি হবে জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস তাই শুধু অতীতের স্মরণ নয়-এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ। এই দিবস আমাদের শেখায়, যখন জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়, তখনই ইতিহাস নতুন পথ নির্মাণ করে।
লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
জেএইচআর