বিশেষ প্রতিবেদক
ডিসেম্বর ২০, ২০২৫, ০২:৩০ পিএম
ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ শনিবার রূপ নেয় এক গভীর শোক ও প্রতিবাদের মিলনস্থলে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের স্রোত নামে জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন এই এলাকায়। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে দক্ষিণ প্লাজার সামনের বিস্তৃত মাঠ।
শনিবার দুপুর ২টার পর জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকেই মানুষ দলে দলে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের দিকে এগোতে থাকে। ফার্মগেট, আসাদগেট, শ্যামলী ও আগারগাঁওসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে সকাল থেকেই জনসমাগম লক্ষ করা যায়। অনেকেই হাতে বা মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে, কেউ কেউ ব্যানার ও ফেস্টুন ছাড়াই নীরব শোক নিয়ে জানাজায় অংশ নিতে আসেন।
মাঠে উপস্থিত মানুষ ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। ‘আমরা সবাই হাদি হব’, ‘হাদির রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘দেশের জন্য লড়াই চলবেই’—এমন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এসব স্লোগানে যেমন ছিল শোক, তেমনি ছিল প্রতিবাদ ও প্রতিজ্ঞার দৃঢ়তা।
কাকরাইল থেকে আসা সাইফুল জামান নামের এক তরুণ বলেন,
হাদি ভাই শুধু একজন নেতা ছিলেন না, তিনি আমাদের কণ্ঠস্বর ছিলেন। জানতাম আজ মানুষের ঢল নামবে, তাই সকালেই চলে এসেছি।
বিপুল জনসমাগমের কারণে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রবেশপথগুলোতে কয়েক স্তরের তল্লাশি চালানো হয়। পুলিশ, র্যাব, আনসার ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। ডিএমপি জানিয়েছে, জানাজা উপলক্ষে প্রায় এক হাজার বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে পুরো কার্যক্রম নজরদারির মধ্যে থাকে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ দিয়ে যান চলাচল সাময়িকভাবে সীমিত করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থান সত্ত্বেও সামগ্রিক পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ।
জানাজার আগে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা দেওয়া হয়। সেখানে জানানো হয়, জানাজায় জাতীয় পতাকা ছাড়া অন্য কোনো পতাকা বহন না করার অনুরোধ জানিয়েছে হাদির পরিবার। উপস্থিত মানুষেরা সেই আহ্বানে সাড়া দেন। পুরো মাঠজুড়ে কেবল লাল-সবুজ পতাকার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
বাদ জোহর অনুষ্ঠিত জানাজাটি ছিল শুধু একটি ব্যক্তিগত বিদায় নয়, বরং একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। অনেকের চোখে জল, অনেকের মুখে নীরবতা—আবার অনেকের কণ্ঠে প্রতিবাদের দৃঢ় উচ্চারণ। জানাজা শেষে মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের দিকে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী শরিফ ওসমান হাদিকে কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে অনেকে প্রতীকী সম্মান হিসেবেও দেখছেন।
এর আগে গত ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন শরিফ ওসমান হাদি। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে বিদেশে নেওয়া হয়েছিল উন্নত চিকিৎসার জন্য। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁর মরদেহ ঢাকায় পৌঁছায়। পরে হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয় মরদেহ।
ময়নাতদন্ত শেষে জানাজার আয়োজন করা হয় জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে।
ওসমান হাদির জানাজায় মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে—তিনি কেবল একটি সংগঠনের নেতা ছিলেন না, বরং একটি প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সহিংসতা, নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে।
শনিবারের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ তাই শুধু জানাজার মাঠ ছিল না; এটি ছিল শোক, প্রতিবাদ ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশার এক সম্মিলিত মঞ্চ।
জেএইচআর