নিজস্ব প্রতিবেদক
জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ১০:৩৫ এএম
জামিন মঞ্জুর হওয়ার পরও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রার্থীদের আর দিনের পর দিন কারাগারের অন্ধ কুঠুরিতে অপেক্ষা করতে হবে না। এখন থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে দ্রুততম সময়ে মুক্তি নিশ্চিত করতে দেশের আটটি জেলায় একযোগে চালু করা হয়েছে ‘ই-বেইল বন্ড’ ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার। বিচার বিভাগের আধুনিকায়ন ও সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি লাঘবে এই ডিজিটাল পদক্ষেপকে এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে দেখছে সরকার।
বুধবার সকালে আইন মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই বিশেষ সফটওয়্যারের উদ্বোধন করেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে এবং জামিননামা জালিয়াতির পথ পুরোপুরি বন্ধ হবে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, “জামিন পাওয়ার পরও মুক্তির জন্য কাউকে আর অনর্থক কারাগারে থাকতে হবে না। আমাদের বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে এই সফটওয়্যারটি তৈরি করা হয়েছে। আগে জামিন হওয়ার পর বিভিন্ন ধাপ পার হতে অনেক সময় লেগে যেত, যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য ছিল চরম মানসিক যন্ত্রণা ও অর্থ ব্যয়ের কারণ। এখন থেকে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে কয়েক ঘণ্টা বা সর্বোচ্চ এক দিনের মধ্যেই একজন ব্যক্তি মুক্তি পাবেন।”
তিনি আরও বলেন, “আগে জামিন পাওয়ার পরও মুক্তির আদেশ কারাগারে পৌঁছাতে কয়েক দিন বা এমনকি এক সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেত। নতুন এই ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিচারকের স্বাক্ষরের পর বেইল বন্ড সরাসরি ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কারাগারে পৌঁছে যাবে। এতে কারাবন্দী ও তাঁদের পরিবারের দুর্ভোগ যেমন কমবে, তেমনি সরকারের অপ্রয়োজনীয় কারা ব্যয়ও সাশ্রয় হবে।”
সফটওয়্যারটির কারিগরি দিক ও সুবিধা সম্পর্কে অনুষ্ঠানে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। মূলত সনাতন পদ্ধতির চিঠিপত্র আদান-প্রদানের পরিবর্তে এখন থেকে পুরো প্রক্রিয়াটি হবে ইন্টারনেট নির্ভর ও স্বয়ংক্রিয়।
১. স্বয়ংক্রিয় বার্তা প্রেরণ: আদালত থেকে জামিননামা স্বাক্ষরিত হওয়ার সাথে সাথে তা সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডিজিটাল ফরমেটে কারাগারে চলে যাবে।
২. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: সিস্টেমে প্রতিটি ধাপের তথ্য এবং কে কখন স্বাক্ষর করছেন তা কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। এতে করে কোনো ফাইল আটকে রাখা বা ইচ্ছাকৃত দেরি করার সুযোগ থাকবে না।
৩. জালিয়াতি রোধ: কাগজের জামিননামায় অনেক সময় জালিয়াতির অভিযোগ উঠত, যা এখন আর সম্ভব হবে না। ডিজিটাল কিউআর কোড বা সিকিউরিটি কোডের মাধ্যমে এর সত্যতা যাচাই করা হবে।
৪. ব্যয় সাশ্রয়: জামিন হওয়ার পর তদবির বা যাতায়াতের পেছনে পরিবারের যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হতো, নতুন এই পদ্ধতিতে তা অনেকটাই কমে আসবে।
ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে অনুষ্ঠিত এই উদ্বোধনী সভায় আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী এবং কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এস এম এরাশাদুল আলম ও খাদেমুল কায়েসসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন আটটি জেলার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, আইনজীবী সমিতি, কারা অধিদপ্তর এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। প্রাথমিকভাবে আটটি জেলায় এটি পরীক্ষামূলক ও সফলভাবে চালুর পর পর্যায়ক্রমে সারা দেশের সব আদালতে এই সেবা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
দেশের আদালতগুলোতে প্রায়ই দেখা যেত, উচ্চ আদালত বা নিম্ন আদালত থেকে বিকেলের দিকে জামিন পেলেও সেই আদেশের কপি ডাকযোগে বা পিয়ন মারফত কারাগারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে যেত। ফলে ওই দিন আর আসামির মুক্তি সম্ভব হতো না। আবার ছুটির দিন থাকলে অপেক্ষা করতে হতো দিনের পর দিন। ‘ই-বেইল বন্ড’ চালুর ফলে এই সেকেলে ব্যবস্থার অবসান ঘটল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ব্যবস্থার ফলে বিচার বিভাগে দুর্নীতির সুযোগ যেমন কমবে, তেমনি মামলা ব্যবস্থাপনায় গতি আসবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বিচার বিভাগ গড়ার পথে এটি একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর আইনজীবীরাও সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, দ্রুততম সময়ে জামিননামা কার্যকর হওয়া ছিল বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি। আজ থেকে সেই দাবির সফল বাস্তবায়ন শুরু হলো।
এএন