আমার সংবাদ ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম
নতুন বছরের শুরুতে স্কুলে নতুন ক্লাসে ওঠার আনন্দ এখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত অভিভাবকদের জন্য অনেকটা মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তানের ভালো ফলের খুশি ছাপিয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় এক বিশাল আর্থিক দুশ্চিন্তা, যার নাম পুনর্ভর্তি ফি। একই স্কুলে, একই শিক্ষকদের অধীনে, কেবল কক্ষ পরিবর্তনের জন্য হাজার হাজার টাকা গুনতে হওয়াটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নীরব প্রথায় পরিণত হয়েছে। এই অরাজকতা রুখতে সরকার গত ৯ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬ জারি করলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ ভুক্তভোগীরা।
নীতিমালার কড়া ভাষা: যা বলছে মন্ত্রণালয়
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের স্বাক্ষরিত নতুন নীতিমালায় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের বর্তমান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরবর্তী শ্রেণিতে ওঠার সময় পুনর্ভর্তি ফি বা এই জাতীয় কোনো অর্থ দাবি করতে পারবে না। নীতিমালায় বলা হয়, এক শ্রেণি থেকে অন্য শ্রেণিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পুনরায় ভর্তি ফি নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। ২০২৪ সালের টিউশন ফি নীতিমালা অনুযায়ী শুধুমাত্র নির্ধারিত বেতন ও যৌক্তিক সেশন ফি নেওয়া যাবে। এছাড়া ভর্তি ফি, সেশন চার্জ, উন্নয়ন ফি এবং বোর্ড পরীক্ষার ফিসহ সব ধরনের আয়ের হিসাব প্রকাশ করতে হবে। এই নির্দেশনা দেশের সব বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসা পর্যায়ে সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নির্দেশনা কি কেবল কাগজের বাঘ হয়েই থাকবে?
নিষেধাজ্ঞার পুরনো ইতিহাস ও বাস্তবতার আড়াল
ইতিহাস বলছে, পুনর্ভর্তি ফি বন্ধে সরকারের কঠোর নির্দেশনা এটাই প্রথম নয়। গত বছরের ১৯ নভেম্বরেও একই ধরনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল। সেখানেও সেশন চার্জ ছাড়া অন্য কোনো ফি নিতে মানা করা হয়েছিল। কিন্তু রাজধানীর নামী স্কুল থেকে শুরু করে মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অধিকাংশই এই নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সরাসরি পুনর্ভর্তি না লিখে রসিদে ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, এখন টাকা নেওয়া হচ্ছে রিলেশন ফি, উন্নয়ন চার্জ, স্কাউট ফি বা আইপিএস ও জেনারেটর ফি এর নামে। রাজধানীর একটি বড় স্কুলের অভিভাবক টিপু সুলতান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তাঁর সন্তানের স্কুলে ফেব্রুয়ারির বেতনের সাথে জেনারেটর ফি হিসেবে ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। সব শাখা মিলিয়ে ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে শুধু এই এক খাতেই কোটি টাকার উপরে আদায় করা হচ্ছে, যার কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই।
ধারের টাকায় ভর্তি: এক বাবার করুণ আর্তি
বেসরকারি টেলিভিশন সাংবাদিক আলী আসগর আকন তাঁর মেয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তির অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে শিউরে ওঠেন। বরিশালের একটি স্কুলে মেয়েকে ভর্তি করতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যাদের একাধিক সন্তান স্কুলে পড়ে, তাদের জন্য বছরের এই শুরুটা বিভীষিকার মতো। ধারদেনা বা ঋণ করে সন্তানদের ভর্তি করতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো জানে সন্তানই আমাদের দুর্বলতা, তাই তারা অনৈতিকভাবে এই বিশাল বোঝা আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে। আরেক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঢাকার একটি স্কুলে তাঁর দুই সন্তানের পুনর্ভর্তিতেই চলে গেছে প্রায় ৪২ হাজার টাকা। এর বাইরে বই খাতা, ড্রেস আর মাসিক বেতন তো আছেই।
আদালত থেকে নীতিমালা: প্রতিরোধের নতুন অস্ত্র
শিক্ষা বাণিজ্যের এই লাগাম টানতে গত ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ আইন ও অধিকার এইড ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করা হয়। সাংবাদিক আলী আসগর ও রাজু আহমেদ এই রিটের মাধ্যমে বেআইনি অর্থ আদায় বন্ধ ও আদায়কৃত অর্থ ফেরতের দাবি জানান। রিট আবেদনের পক্ষের আইনজীবীরা জানান, দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর পুনর্ভর্তি বাবদ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বাণিজ্য হয়। রিটের প্রেক্ষাপটেই সরকার দ্রুত নতুন নীতিমালাটি সামনে আনে। তবে সংশয় রয়ে গেছে একটি জায়গায়, যারা ইতিমধ্যেই ২০২৬ সালের ফি দিয়ে দিয়েছেন, তারা কি তা ফেরত পাবেন? নতুন নীতিমালায় টাকা ফেরতের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়নি।
সংশয় কেন কাটছে না?
অভিভাবকদের সংশয়ের পেছনে শক্ত ভিত্তি রয়েছে। তারা মনে করেন, সরকার নীতিমালা দেয় ঠিকই, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কোনো সক্রিয় নজরদারি দেখা যায় না। এছাড়া সরাসরি ভর্তি না লিখে সেশন ফি বাড়িয়ে দিয়ে বা অপ্রয়োজনীয় খাতের সৃষ্টি করে স্কুলগুলো আইন ফাঁকি দিচ্ছে। নীতিমালা কবে থেকে এবং কীভাবে কঠোরভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট গাইডলাইন বা হেল্পলাইন নেই। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান বলছে, দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এই বিশাল জনবল ও তাদের অভিভাবকদের রক্ষা করতে হলে কেবল নীতিমালা জারিই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ভ্রাম্যমাণ আদালত বা বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান।
প্রত্যাশা বনাম প্রাপ্তি
শিক্ষা এখন আর কোনো দয়া নয়, এটি সাংবিধানিক অধিকার। অথচ পুনর্ভর্তি ফির নামে যে চাঁদাবাজি চলছে, তা মধ্যবিত্তের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। অভিভাবক সমাজের এখন একটাই চাওয়া, নতুন নীতিমালা যেন কেবল দাপ্তরিক ফাইল বন্দি না থেকে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ জিম্মি করে শিক্ষা বাণিজ্যের এই অবসান কি সত্যিই হবে? উত্তরটি সময়ের গর্ভে লুকিয়ে থাকলেও, প্রতিরোধের সুরটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো।
জেএইচআর