নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬, ১০:৫৭ এএম
সদ্য গঠিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় পুলিশ বাহিনীতে শুরু হয়েছে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রবল চাপ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে চালু হওয়া পুলিশের নতুন ইউনিফর্ম নিয়ে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আনুষ্ঠানিকভাবে এই পোশাক বাতিলের দাবি জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। বাহিনীর সদস্যদের মতে, এই ইউনিফর্ম নির্ধারণে তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি এবং এটি অপেশাদার দৃষ্টিভঙ্গির ফসল।
তৃণমূল থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, এই বিতর্কিত ইউনিফর্ম পরিবর্তন করে দ্রুত একটি মর্যাদাপূর্ণ ও আরামদায়ক পোশাক নির্ধারণ করা হোক। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বারবার পোশাক পরিবর্তন করলে সরকারের শত শত কোটি টাকা লোকসান হবে, যা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, বর্তমান ইউনিফর্ম নির্ধারণের সময় বাহিনীর মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের চাওয়া-পাওয়া বা দেশের আবহাওয়ার কথা চিন্তা করা হয়নি। বিশেষ করে এই পোশাকের রং ও ডিজাইনের সাথে বিভিন্ন মার্কেট বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিকিউরিটি গার্ডদের পোশাকের অদ্ভুত মিল রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে পুলিশ ও সাধারণ নিরাপত্তা কর্মীদের আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা পুলিশের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
কাপড়ের মান এতটাই নিম্নমানের যে দুই-তিনবার ধোয়ার পরই রং চটে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন পুলিশ সদস্যরা। তাছাড়া বর্তমান কাপড়টি বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়ার উপযোগী নয় ও বিভিন্ন সংস্থার পোশাকের সাথে মিল থাকায় পেশাদারিত্বের ছাপ থাকছে না।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হকের মতে, পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি ছিল অপ্রয়োজনীয় এবং এর পেছনে কোনো বাস্তবসম্মত কারণ ছিল না। তিনি বলেন, ব্যক্তি ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে কোটি কোটি টাকার অপচয় করা হয়েছে। এখন যদি আবারও পোশাক বদলাতে হয়, তবে রাষ্ট্রকে বিপুল অংকের আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হতে হবে।
উল্লেখ্য, পুলিশ বাহিনীর জন্য বছরে লক্ষ লক্ষ সেট পোশাক তৈরি করতে হয়। একবার সেট পরিবর্তন মানেই বিপুল পরিমাণ মজুদকৃত কাপড় ও তৈরি পোশাক বাতিল হয়ে যাওয়া। অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে নতুন সরকারের জন্য এই খরচ বহন করা অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাউয়ুম এই ইউনিফর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে ‘হঠকারী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, শুধু পোশাক বদলালেই পুলিশ বাহিনীর চরিত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। তিনি মনে করেন, আগের জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশের যে সনাতনী ইউনিফর্ম ছিল, সেটিই বাহিনীর আভিজাত্য ও মর্যাদার সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। পেশাদারিত্ব উপেক্ষা করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখন পুরো বাহিনীকে তার খেসারত দিতে হচ্ছে।
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে যেন দ্রুত এই পোশাক পুনর্বিবেচনা করা হয়। তারা প্রয়োজনে আগের পরিচিত ইউনিফর্মে ফিরে যেতে অথবা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নতুন কোনো ‘ডিগনিফাইড’ ইউনিফর্ম নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে।
তবে নতুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সামনে এটি একটি বড় পরীক্ষা। একদিকে বাহিনীর তুঙ্গে থাকা অসন্তোষ দূর করে মনোবল চাঙ্গা করা, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কোটি কোটি টাকা অপচয় ঠেকানো এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।
বলা হয়ে থাকে, পুলিশ হলো নাগরিক নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী। কিন্তু সেই প্রহরীরাই যদি তাদের পোশাক নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেন বা সাধারণ মানুষের কাছে বিভ্রান্তির শিকার হন, তবে তাদের কর্মস্পৃহা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। পুলিশের দাবি, তাদের এমন একটি পোশাক দেওয়া হোক যা দেখে জনগণ শ্রদ্ধা করবে এবং অপরাধীরা ভয় পাবে।
পুলিশের ইউনিফর্ম বিতর্ক এখন কেবল একটি পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন রাষ্ট্রীয় অর্থের সদ্ব্যবহার এবং বাহিনীর আত্মমর্যাদার প্রশ্নে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রশাসনিক প্রতিটি স্তরে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তার ঢেউ এখন পুলিশের পোশাকে এসে লেগেছে। সরকার কি কোটি কোটি টাকার লোকসান মেনে নিয়ে বাহিনীর সন্তুষ্টির জন্য পুনরায় পোশাক বদলাবে, নাকি বর্তমান পোশাকেই সংস্কার আনবে তা দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো দেশ।
এএন