নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ৪, ২০২৬, ১১:০৬ এএম
তারেক রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ দেড় দশক পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়েছে বিএনপি। সরকার গঠনের ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে কারা আসছেন?
আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে সামনে রেখে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। দলের হাইকমান্ড এমন এক সমীকরণ মেলাতে চাইছে যেখানে অভিজ্ঞতার সাথে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটে।
বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ এখনো বহাল থাকলেও রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন উঠেছে যে, বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে পরিবর্তন করা সময়ের দাবি। বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর বড় একটি অংশ মনে করে, একটি নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি পদেও পরিবর্তন আসা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতি পদের দৌড়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, মন্ত্রী হিসেবে অভিজ্ঞতা এবং দলের সংকটের সময় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে এই পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য করে তুলেছে।
মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামও আলোচনায় ছিল। তবে তিনি বর্তমানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। গতকাল রাতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, "বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কেন এই আলোচনা?" তাঁর মতে, বিএনপিতে রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো অন্তত তিন-চারজন যোগ্য নেতা রয়েছেন, তবে সংবিধানের নিয়ম মেনেই সব হওয়া উচিত।
১২ মার্চ সংসদের প্রথম বৈঠকেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হবে। স্পিকার পদের জন্য বিএনপি এমন একজনকে খুঁজছে যিনি সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি এবং সংবিধানের ওপর গভীর দখল রাখেন। এই পদের জন্য তিনটি নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে:
মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ: বর্তমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এবং ছয়বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা এবং সংসদীয় বিতর্কে তাঁর ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তাঁকে স্পিকার পদের শক্ত দাবিদার করে তুলেছে।
ড. ওসমান ফারুক: সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এবং অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর পরিচিতি এবং শান্ত মেজাজের কারণে সংসদ পরিচালনার জন্য তাঁকে উপযুক্ত মনে করা হচ্ছে।
জয়নুল আবেদীন: সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হলেও সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর খ্যাতি আকাশচুম্বী। জটিল আইনি মারপ্যাঁচ এবং সংসদীয় বিধিবিধান ব্যাখ্যায় তাঁর দক্ষতা দলের নীতিনির্ধারকদের নজর কেড়েছে।
বিএনপির নতুন সরকার একটি বড় চমক দিয়েছে ‘জাতীয় সমঝোতার’ ক্ষেত্রে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটকে সম্মান জানিয়ে ডেপুটি স্পিকার পদটি প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা, যেখানে সরকারি দল স্বেচ্ছায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ বিরোধী দলকে ছেড়ে দিচ্ছে। জামায়াতকে ইতিমধ্যেই তাদের পছন্দের নাম প্রস্তাব করতে বলা হয়েছে।
বর্তমান সংবিধানে ‘সংসদ উপনেতা’ পদের কোনো সরাসরি বিধান নেই। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তবে অতীতে রাজনৈতিক প্রয়োজনে এই পদটি ব্যবহারের নজির রয়েছে। বিএনপির একটি অংশ মনে করে, সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) ওপর কাজের চাপ কমাতে এবং সংসদীয় কার্যক্রমে গতি আনতে একজন অভিজ্ঞ উপনেতা নিয়োগ দেওয়া যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো তারেক রহমানের টেবিল থেকে আসেনি।
সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, অধিবেশন শুরুর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্পিকার পদের জন্য লিখিত প্রস্তাব জমা দিতে হয়। এই প্রস্তাবটি একজন সদস্য উত্থাপন করবেন এবং অন্য একজন সমর্থন করবেন। যদি একাধিক প্রার্থী থাকে, তবে ‘বিভক্তি-ভোট’ বা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে। যেহেতু ত্রয়োদশ সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাই তাদের মনোনীত প্রার্থীই যে স্পিকার হচ্ছেন, তা নিশ্চিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি এখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাড়াহুড়ো করতে চাইছে না। তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো ১২ মার্চের অধিবেশন সফলভাবে শুরু করা এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন করা। এরই মধ্যে সংসদের চিফ হুইপ ও হুইপদের প্যানেল চূড়ান্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদের পরিবর্তনটি হয়তো পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে একটি আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমান এই পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘রিওয়ার্ড’ বা পুরস্কার দেওয়ার চেয়ে ‘যোগ্যতা’ ও ‘ক্লিন ইমেজ’কে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। বিশেষ করে জয়নুল আবেদীনের মতো আইনি বিশেষজ্ঞ বা হাফিজ উদ্দিন আহমদের মতো বর্ষীয়ান নেতাদের নাম আলোচনায় আসায় এটি স্পষ্ট যে, সংসদকে একটি কার্যকর তর্কের কেন্দ্রে পরিণত করতে চায় নতুন সরকার।
আগামী এক সপ্তাহ বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১২ মার্চ যখন সংসদ বসবে, তখনই পর্দা উন্মোচিত হবে যে কার মাথায় উঠছে স্পিকারের মুকুট আর বঙ্গভবনের নতুন অভিভাবক হওয়ার দৌড়ে শেষ হাসি কে হাসছেন। অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক কৌশলের এই মহাযুদ্ধে বিএনপি শেষ পর্যন্ত কাদের ওপর আস্থা রাখে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এএন