নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ৭, ২০২৬, ০৪:২২ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির আঁচ বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে লাগলেও সরকার দাবি করছে, দেশে তেলের কোনো ঘাটতি নেই। শনিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আগামী ৯ মার্চ আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ (ভেসেল) বন্দরে পৌঁছাবে।
তবে যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বর্তমানে যে ‘রেশনিং’ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, তা এখনই শিথিল করা হচ্ছে না।
শনিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকারপ্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে এক জরুরি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান মন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৪ নম্বর গেটে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে মানুষের মধ্যে একটি স্বাভাবিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সরকারিভাবে আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, দেশে তেলের কোনো অভাব নেই।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তেল মজুত আছে। এর বাইরেও আগামী ৯ মার্চ আরও দুটি তেলের জাহাজ আমাদের জলসীমায় পৌঁছাবে। সুতরাং সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো অবকাশ নেই।’
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, মানুষ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনা ও মজুত শুরু করায় পাম্পগুলোতে ভিড় বেড়েছে। তিনি গণমাধ্যমের মাধ্যমে দেশবাসীকে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা না করার অনুরোধ জানান।
পাম্পগুলোতে তেলের জন্য হাহাকার এবং দীর্ঘ লাইন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকার যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে, তা মূলত এক ধরণের দূরদর্শী প্রস্তুতি। যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে তা অনিশ্চিত বলেই বর্তমান মজুতকে হিসাব করে খরচ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে অনেক পাম্পে তেল থাকা সত্ত্বেও বিক্রি না করার অভিযোগ উঠেছে। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন:
আগামীকাল রোববার থেকে সারাদেশে পাম্পগুলোতে তদারকি করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।
কোনো পাম্প মালিক কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে বা মজুত করে রাখলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাম্পগুলোতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কোনো পাম্প যদি দ্রুত সেই বরাদ্দ বিক্রি করে ফেলে, তবে তাদের পরবর্তী দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
বর্তমানে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য দিনে মাত্র দুই লিটার তেল বরাদ্দের নিয়ম চালু করা হয়েছে। এতে রাইড শেয়ারিং চালকসহ সাধারণ বাইকাররা বিপাকে পড়েছেন। রেশনিংয়ের এই পরিমাণ বাড়ানোর কোনো সম্ভাবনা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন যে, এই মুহূর্তে তা বাড়ানো সম্ভব নয়।
মন্ত্রী বলেন, ‘পর্যাপ্ত তেল থাকলেও যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সঞ্চয়ী হতে হবে। আমাদের কাছে যা আছে, তা দিয়ে লম্বা সময় চলতে হবে। তাই সঞ্চয়ের মানসিকতা নিয়ে আমাদের হিসাব করে চলতে হবে। ঘাটতি পড়ার কোনো সুযোগ আমরা দেব না, তবে সতর্ক থাকা জরুরি।’
মন্ত্রীর এই আশ্বাসের বিপরীতে রাজধানীর রাজপথের চিত্র ভিন্ন। শনিবার সকাল থেকেই ঢাকার অধিকাংশ পাম্পে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক পাম্প ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে গেট বন্ধ করে রেখেছে। বিশেষ করে পাঠাও বা উবারের মতো রাইড শেয়ারিং পেশায় নিয়োজিত চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। দুই লিটার তেল নিয়ে দিনভর গাড়ি চালানো সম্ভব নয় বলে দাবি করছেন তাঁরা।
মন্ত্রীর বক্তব্যে তেল পাওয়ার বিষয়টি ‘স নিশ্চিত’ করা হলেও লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় নষ্ট হওয়ার বিড়ম্বনা থেকে এখনই মুক্তি পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, সাধারণ মানুষ যদি রেশনিং মেনে স্বাভাবিক কেনাকাটা করে, তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পাম্পের ভিড় কমে আসবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি শৃঙ্খলাকে তছনছ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ সেই ঝড়ের বাইরে নয়। সরকার ৯ মার্চের চালানের কথা বলে সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করলেও দীর্ঘমেয়াদী সংকটের আশঙ্কা রয়েই গেছে। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের তদারকি যদি সঠিকভাবে কার্যকর হয়, তবে কালোবাজারি ও কৃত্রিম সংকটের দৌরাত্ম্য কমতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ৯ মার্চের সেই জাহাজ দুটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় কতটুকু ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে।
এএন