নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ২৮, ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
দেশের চিকিৎসা শিক্ষার মান রক্ষা এবং জনস্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর নজিরবিহীন অনিয়মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। ছুটির দিনের অলস দুপুরে সচিবালয়ে আকস্মিক উপস্থিত হয়ে ফাইল পর্যালোচনার সময় একের পর এক ভয়ংকর জালিয়াতি ধরা পড়লে তিনি এই কঠোর অবস্থান নেন।
প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ভুয়া ক্লিনিক ও নার্সের মতো ‘ভুয়া ডাক্তার তৈরির কারখানা’ কোনোভাবেই চলতে দেওয়া হবে না।
শনিবার দুপুরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দাপ্তরিক নথিপত্র পর্যালোচনার সময় বিম্ময়কর সব অনিয়ম প্রতিমন্ত্রীর নজরে আসে। সাধারণত ছুটির দিনে সচিবালয় শান্ত থাকলেও জনস্বার্থের তাগিদে মন্ত্রণালয়ে হাজির হন ড. এম এ মুহিত। ফাইলগুলোতে দেখা যায়, অনেক নামী-দামী বেসরকারি মেডিকেল কলেজ বছরের পর বছর ধরে নূন্যতম শর্ত পূরণ না করেই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
পর্যালোচনা শেষে এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় প্রতিমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমি এমন কিছু কলেজের ফাইল দেখছি, যারা বিন্দুমাত্র নীতি-নিয়মের তোয়াক্কা করছে না। এগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বদলে নিছক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর তদন্তে বেরিয়ে আসা সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো বেশ কিছু মেডিকেল কলেজের নিজস্ব কোনো হাসপাতাল নেই, কিংবা থাকলেও সেখানে কোনো রোগী নেই।
পর্যাপ্ত শয্যা ও রোগী না থাকলে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পাচ্ছেন না। অনেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) কোনো বৈধ অনুমোদন ছাড়াই ছাত্র ভর্তি করাচ্ছে। অনেক কলেজের নিজস্ব জমিও নেই, এমনকি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখার মতো প্রয়োজনীয় আমানতের দলিলপত্রও গায়েব।
ড. এম এ মুহিত প্রশ্ন তোলেন, সেখানে না আছে হাসপাতাল, না আছে রোগী। তাহলে শিক্ষার্থীরা সেখানে ভর্তি হয়ে কীভাবে দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে গড়ে উঠবেন? প্রশিক্ষণহীন এই ছাত্ররা যখন ডিগ্রি নিয়ে বের হবেন, তখন দেশের জনগণের জীবন চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে।
প্রতিমন্ত্রী তার বার্তায় প্রতারিত অভিভাবকদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, বাবা-মায়েরা তাদের সারা জীবনের কষ্টার্জিত অর্থ সন্তানদের ভবিষ্যতের পেছনে ব্যয় করছেন। কিন্তু এক শ্রেণির কুচক্রী ব্যবসায়ী শিক্ষার নামে দোকান খুলে বসে তাদের সন্তানদের জীবন ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটি কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং একটি জাতীয় বিপর্যয়।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, প্রতিটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজকে একটি ‘মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড’ বা নূন্যতম মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে। এই স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে কোনো অযুহাতেই প্রতিষ্ঠান চলতে দেওয়া হবে না। তিনি বর্তমান সরকারকে ‘অনিয়ম থেকে নিয়মের বাংলাদেশ’ গড়ার সরকার হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমরা ভুয়া ক্লিনিক বন্ধ করেছি, ভুয়া নার্সদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। এখন এই উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষার নামে ভুয়া ডাক্তার তৈরির কারখানাও আমাদের সমূলে বন্ধ করতে হবে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই পর্যালোচনার পর একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। যারা প্রতিটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে সরেজমিনে পরিদর্শন করে পরিকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ যাচাই করবেন। শর্ত পূরণ করতে না পারা কলেজগুলোর লাইসেন্স বাতিলসহ তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থান দেশের ভেঙে পড়া চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থায় আশার আলো দেখাচ্ছে। সদিচ্ছা থাকলে ছুটির দিনেও যে অনিয়মের শেকড় উপড়ানো সম্ভব, ড. এম এ মুহিত তা প্রমাণ করেছেন। এখন দেখার বিষয়, প্রভাবশালী মহলের চাপ উপেক্ষা করে এই ‘মৌসুমি চিকিৎসক’ তৈরির কারখানাগুলো কত দ্রুত বন্ধ করা যায়। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এটি এখন সময়ের দাবি।
এএন