নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ২, ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম
বর্তমান সরকারের অন্যতম উচ্চাভিলাষী ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশাল অংকের বাজেট। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের ৪০ লাখ নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীপ্রধানকে এই সুবিধার আওতায় আনতে সরকারের প্রয়োজন হবে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।
এই বিশাল অংকের অর্থ কোন খাত থেকে আসবে এবং কীভাবে এর সংস্থান হবে, তা নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
আগামী অর্থবছর (জুলাই ২০২৬ - জুন ২০২৭) থেকে দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ডের মূল কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। গত ৩১ মার্চ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে দেওয়া এক আধা সরকারি (ডিও) পত্রে সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন ১৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের অনুরোধ জানিয়েছেন।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, নারীর ক্ষমতায়ন, মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। পরিবারের নারীপ্রধানের নামে এই কার্ড ইস্যু করার মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
নির্বাচনী ইশতেহার ও ফ্যামিলি কার্ডের লক্ষ্য
বিএনপি তাদের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষায় এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, প্রতিটি কার্ডধারী পরিবার প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সহায়তা পাবে।
গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। বর্তমানে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইলট প্রকল্পের আওতায় ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারী এই কার্ডের সুবিধা পাচ্ছেন। আগামী অর্থবছর থেকে এই সংখ্যা ৪০ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থসংস্থানের বিকল্প উৎস: টিআর ও কাবিখা একীভূত করার চিন্তা
১৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল জোগান দিতে গিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে। গত ২৫ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক ত্রিপক্ষীয় সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে একটি অংশ ফ্যামিলি কার্ডে স্থানান্তরের বিষয়ে আলোচনা হয়।
আন্তপ্রকল্প দ্বৈততা রোধ: সভায় দেখা যায়, টেস্ট রিলিফ (টিআর), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) এবং মানবিক সহায়তা খাতে আগামী অর্থবছরে ৭ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, একই ধরনের সহায়তা একাধিক মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়ার ফলে কাজে দ্বৈততা তৈরি হচ্ছে।
একীভূত কর্মসূচি: টিআর ও কাবিখার মতো পুরনো কর্মসূচিগুলোকে ফ্যামিলি কার্ডের সাথে একীভূত করে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে অপচয় কমবে এবং প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন সহজ হবে। তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেই আসতে হবে।
অর্থনীতির সংকট ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই বিশাল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সর্তক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান মনে করেন, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এর স্বচ্ছতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, অন্যান্য কম গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে ব্যয় কাটছাঁট করে এখানে বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি যেন এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হন এবং কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও যোগ করেন যে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতীতে এত বড় বাজেট পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই, তাই তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকেও নজর দিতে হবে।
ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের বর্তমান চিত্র
আগামী অর্থবছরে এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে ৪০ লাখ পরিবার, যা প্রধানত নারীপ্রধান পরিবার। প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে ১৩,০০০ কোটি টাকা। সুবিধাভোগীরা প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা বা সমমূল্যের পণ্য পাবেন। পাইলট প্রকল্পের বর্তমান অবস্থায় জুন পর্যন্ত ৩৭,৫৬৭ জন উপকারভোগীর জন্য ৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে অর্থসংস্থান নিশ্চিত করা, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং সঠিক ডেটাবেজ তৈরি করা।
এদিকে সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়া হচ্ছে না। ফলে এটি মূল্যস্ফীতির ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। সরকার নিজস্ব আয় এবং বাজেট পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমেই এই অর্থের জোগান দিতে চায়।
আগামী অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ড কি প্রান্তিক মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারবে? ১৩ হাজার কোটি টাকার সংস্থান কি কোনো নতুন করের বোঝা চাপাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে আগামী জুনের বাজেট অধিবেশনে। তবে আপাতত অর্থ মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় তাদের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, যাতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং জনকল্যাণ উভয়ই নিশ্চিত করা যায়।
এএন