নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ২, ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
দেশে চলমান জ্বালানি তেলের সংকটকে ‘বাস্তব সংকটের চেয়ে মানসিক আতঙ্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন।
মন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, দেশে তেলের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বিশেষ করে ইরান কেন্দ্রিক সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘আতঙ্ক’ তৈরি হয়েছে। যার ফলে সাধারণ সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি তেল একযোগে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি মন্ত্রী সংসদে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলেন, আগে যে পরিমাণ তেল বিক্রি হতে দেড় দিন বা ৩৬ ঘণ্টা সময় লাগত, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই একই পরিমাণ তেল মাত্র ২ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বিষয়টিকে ‘প্যানিক বায়িং’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পাম্পগুলোতে ভিড় করছে। একজনের হয়তো ৫ লিটার তেল প্রয়োজন, কিন্তু সে আতঙ্কে ২০ লিটার নিয়ে রাখছে। এই গণ-অস্থিরতার কারণেই পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে এবং দ্রুত মজুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও যোগ করেন, সরকার যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করার কথা, ঠিক সেই পরিমাণই দিচ্ছে। কিন্তু চাহিদার এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন সামাল দেওয়া যেকোনো ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের জন্যই চ্যালেঞ্জিং।
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, ইরানের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এই গুজবের ওপর ভিত্তি করেই দেশীয় বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "জ্বালানি নেই এই তথ্যটি সম্পূর্ণ অসত্য। আমাদের মজুত পর্যাপ্ত, তবে সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে জনগণের শান্ত থাকা জরুরি।
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি দেশবাসীকে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান।
সংসদে তিনি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন, সকল বিপণিবিতান, শপিংমল এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বাইরের আলোকসজ্জা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি সকল অফিসে এয়ার কন্ডিশনার (AC) এর তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না রাখার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচ কমিয়ে সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের ওপর তিনি জোর দেন।
আজকের সংসদ অধিবেশনে মন্ত্রী দেশের সকল দোকানপাট ও শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার সিদ্ধান্তের বিষয়টিকে স্বাগত জানান। তিনি মনে করেন, ব্যবসায়ী মালিক সমিতি যে উদ্যোগ নিয়েছে তা জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে বিশাল ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, যখন সারা বিশ্ব জ্বালানি সাশ্রয়ের পথে হাঁটছে, তখন আমাদেরও বিলাসিতা ত্যাগ করতে হবে।
সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর প্রশ্নের প্রেক্ষিতে মন্ত্রী যখন আশ্বস্ত করছিলেন, তখন বিরোধী দলীয় ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের মধ্যে গুঞ্জন দেখা দেয়। কারণ, মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে-পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মানুষ তেল পাচ্ছে না। চুয়াডাঙ্গার মতো জেলায় যেখানে তাপমাত্রা ৩৮.৫ ডিগ্রিতে পৌঁছেছে এবং রাস্তার পিচ গলছে, সেখানে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন মানুষের ভোগান্তিকে চরমে নিয়ে গেছে।
মন্ত্রী অবশ্য দাবি করেছেন, প্রশাসন কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং করছে যাতে কেউ অবৈধভাবে তেল মজুত করে খোলা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করতে না পারে।
জ্বালানি মন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষে দেশের সকল স্তরের মানুষকে ধৈর্য ধরার এবং সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের আতঙ্ক দূর হলে এবং গুজবে কান না দিলে সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল হওয়া পর্যন্ত এই সংযম বজায় রাখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
সংসদ অধিবেশন শেষে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মন্ত্রীর এই 'দেড় দিনের তেল ২ ঘণ্টায় বিক্রি' হওয়ার তথ্যটি জনমানসে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে এটি সরকারের সরবরাহ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে, অন্যদিকে এটি জনগণের সচেতনতার প্রয়োজনীয়তাকেও ফুটিয়ে তোলে।
এএন