আমার সংবাদ ধর্ম ডেস্ক
ডিসেম্বর ৬, ২০২৫, ১২:২৩ পিএম
ইসলামের নামাজব্যবস্থায় বেতের একটি বিশেষ আমল। এটি ফরজ না হলেও অত্যন্ত জোরালো সুন্নত সুন্নতে মুআক্কাদা। বরং অনেক ফকীহ বলেছেন, বেতের নামাজের মর্যাদা এতই উচ্চ যে তা ছাড়ার অভ্যাস করা ঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে জীবনের শেষ পর্যন্ত নিয়মিত বেতের পড়েছেন এবং তাঁর সাহাবিদেরও এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন। তাই মুসলমানের নামাজী জীবনে বেতের নামাজ শুধু একটি অতিরিক্ত ইবাদত নয়; বরং রাতের ইবাদতের একটি শক্ত ভিত্তি।
‘বিতর’ শব্দের অর্থ বিজোড়। অর্থাৎ এ নামাজের রাকাত সংখ্যা সর্বদা বিজোড় ১, ৩, ৫, ৭ বা তার বেশি। আমাদের দেশে সাধারণত তিন রাকাত বেতের নামাজ প্রচলিত, যা এশার নামাজের পর আদায় করা উত্তম। তবে সারা রাতই এর সময় এশার পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরুর পূর্ব পর্যন্ত।
বেতের নামাজ রাতের ইবাদতের সমাপনী ইবাদত হিসেবে গণ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রাতের নামাজের সমাপ্তি হোক বেতের দ্বারা। (সহিহ মুসলিম) এ থেকে বোঝা যায়, বেতের নামাজ যেন দিনের বরং রাতের ইবাদতের শেষ সীলমোহর।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম প্রিয় আমল: বেতের নামাজ তিনি কখনো ছেড়েননি। মুসাফির অবস্থায়, অসুস্থতার সময়েও তিনি বেতের নামাজ আদায় করতেন। তাঁর শিক্ষাইনুসারে, যে ব্যক্তি বেতের নামাজ নিয়মিত আদায় করে, সে আল্লাহর বিশেষ রহমতের যোগ্য হয়।
রাতের অন্ধকারে আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়: রাতের নামাজ আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় ইবাদতগুলোর একটি। আর বেতের সেই রাতের ইবাদতের প্রধান স্তম্ভ। সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে একান্ত নিবিড়তায় দাঁড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করে বেতের নামাজ। হাদিসে আছে,আল্লাহ বেজোড় (ওয়িত্র), তিনি বিজোড় পছন্দ করেন। (তিরমিজি) অতএব বেতের নামাজ আল্লাহর পছন্দনীয় ইবাদত।
দোয়া-কুনুতের মাধ্যমে রহমত প্রার্থনা: বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে তিন রাকাত বেতের নামাজে দোয়া-কুনুত পাঠ করা প্রচলিত। এটি মূলত এক বিশেষ দোয়া, যেখানে বান্দা আল্লাহর কাছে পথনির্দেশ, নিরাপত্তা, ক্ষমা ও রহমত কামনা করে। দোয়া-কুনুত মানুষের অন্তরকে নম্র করে, আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ নির্ভরতার প্রকাশ ঘটায়।
ঈমান শক্তিশালী করার মাধ্যম: নামাজ আত্মার প্রশান্তি আনে আর বেতের সেই প্রশান্তিকে গভীরতর করে। দিনের ব্যস্ততার পর রাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সামনে কান্নাকাটি, তাসবিহ, দোয়া এসব হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, পাপ থেকে দূরে রাখে এবং ঈমানকে শক্তিশালী করে।
নফল নামাজের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ: ফরজ বাদ দিয়ে নফল ইবাদতের মধ্যে বেতের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনেক ফকীহ বলেছেন, ফরজের পরে বেতের নামাজের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশে সাধারণত ৩ রাকাত বেতের নামাজ জামাআতে পড়ানো হয়, তবে একা পড়াও জায়েজ। প্রথম দুই রাকাত সাধারণ নামাজের মতো। তৃতীয় রাকাতে রুকুতে যাওয়ার আগে ইমাম বা ব্যক্তি দোয়া-কুনুত পড়ে থাকে।
দোয়া-কুনুতের অর্থ ও তাৎপর্য: এই দোয়াতে বান্দা ঘোষণা করে, আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নয়, আমরা তাঁর সাহায্য চাই, তাঁরই ওপর ভরসা করি, তাঁরই দিকে ফিরে যাই। দোয়া-কুনুত মূলত আত্মসমর্পণের ঘোষণা। এটি মুসলিম জীবনে নিয়মিত পাঠ করলে আল্লাহর সাহায্য সর্বদা সঙ্গে থাকে।
বেতের নামাজের সময়: বেতের নামাজের সময় এশার নামাজের পরে শুরু হয় এবং ফজরের সময় শুরুর পূর্ব পর্যন্ত থাকে। রাতের শেষ ভাগে পড়া বেশি ফজিলতপূর্ণ। তবে যারা তাহাজ্জুদ নিয়মিত পড়তে পারেন না বা ঘুমের কারণে উঠতে পারবেন কি না নিশ্চিত নন তাদের জন্য এশার পরপর বেতের পড়াই উত্তম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আশঙ্কা করে যে রাত শেষে উঠতে পারবে না, সে রাতের প্রথম ভাগে বেতের পড়ুক। (সহিহ মুসলিম) বতের নামাজের গুরুত্ব কেন বাড়ে?
বর্তমান সমাজে ব্যস্ততা, মানসিক চাপ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের সময়ে বেতের নামাজ মানুষকে আধ্যাত্মিকভাবে দৃঢ় রাখে। পরিবারে সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই বেতের নামাজের অভ্যাস করানো তাদের শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও আল্লাহভীতি বাড়ায়। কেবল রমজান নয় পুরো বছরের প্রতিটি রাতেই বেতের নামাজ পড়লে মানুষ অন্তরের শান্তি পায় এবং ঈমানের দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায়।
বেতের নামাজ মুসলমানের জন্য বিরাট এক দান। এটি একদিকে নফল ইবাদত, অন্যদিকে রাতের সীলমোহর। জীবনের নানা ব্যস্ততা ও বিপদের মধ্যেও যে ব্যক্তি বেতের নামাজ নিয়মিত পালন করে, সে আল্লাহর বিশেষ রহমত, হিফাজত ও নৈকট্যের যোগ্য হয়ে ওঠে। তাই প্রতিটি মুসলমানের জন্য বেতের নামাজ জীবনে ধারণ করা শুধু একটি আমল নয় বরং আধ্যাত্মিক উন্নতির অপরিহার্য পথ।
জেএইচআর