ধর্ম ডেস্ক
ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫, ০৬:০৮ পিএম
ইসলামে নামাজ সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। ফরজ নামাজের পাশাপাশি কিছু নামাজ রয়েছে, যা ইসলামের সৌন্দর্য ও পূর্ণতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বিতর নামাজ তেমনই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি রাতের নামাজের শেষাংশে আদায় করা হয় এবং আল্লাহর নিকট বান্দার আত্মসমর্পণের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
‘বিতর’ শব্দের অর্থ এক বা বেজোড়। ইসলামী শরিয়তে এশার নামাজের পর রাতের বেলা আদায়কৃত বেজোড় রাকাতবিশিষ্ট নামাজকে বিতর নামাজ বলা হয়। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ বেজোড়, তিনি বেজোড়কে ভালোবাসেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
হানাফি মাজহাব মতে বিতর নামাজ ওয়াজিব। অন্যান্য মাজহাব মতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনোই বিতর নামাজ ছেড়ে দেননি, সফর কিংবা অসুস্থতার সময়ও নয়। এ থেকেই বিতরের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।
বিতর নামাজের সময় শুরু হয় এশার ফরজ ও সুন্নাহ নামাজ আদায়ের পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত। যারা তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন, তাদের জন্য উত্তম হলো তাহাজ্জুদের পর সর্বশেষ নামাজ হিসেবে বিতর আদায় করা। আর যারা রাতে ওঠার বিষয়ে অনিশ্চিত, তাদের জন্য এশার পর বিতর পড়ে নেওয়াই উত্তম।
বিতর নামাজ বেজোড় রাকাতের হয়ে থাকে। সাধারণভাবে এক, তিন, পাঁচ কিংবা সাত রাকাত পর্যন্ত পড়া যায়। তবে হানাফি মাজহাবে তিন রাকাত বিতর নামাজ আদায় করাই প্রচলিত ও ওয়াজিব হিসেবে গণ্য। তিন রাকাত বিতর নামাজে দুই রাকাতের পর বসে তাশাহহুদ পড়ে তৃতীয় রাকাতে দাঁড়ানো হয়।
নিয়ত করা: মনে মনে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তিন রাকাত বিতর নামাজ পড়ার নিয়ত করতে হবে।
প্রথম রাকাত: তাকবিরে তাহরিমা বলে নামাজ শুরু করতে হবে। সানা পড়ে সুরা ফাতিহা এবং যেকোনো একটি সুরা পড়তে হবে। এরপর রুকু ও সিজদা করে দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়াতে হবে।
দ্বিতীয় রাকাত: সুরা ফাতিহা ও অন্য একটি সুরা পড়ে রুকু, সিজদা শেষে বসে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) পড়ে তৃতীয় রাকাতে দাঁড়াতে হবে।
তৃতীয় রাকাত ও দোয়া কুনুত: সুরা ফাতিহা ও অন্য একটি সুরা পড়ার পর অতিরিক্ত তাকবির বলে হাত উঠিয়ে দোয়া কুনুত পড়তে হবে। এরপর রুকুতে যেতে হবে। দোয়া কুনুত আরবিতে পড়া উত্তম, না পারলে নিজের ভাষায় দোয়া করা যায়।
নামাজ শেষ করা: রুকু, সিজদা শেষে বসে তাশাহহুদ, দরুদ শরিফ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হবে।
দোয়া কুনুত বিতর নামাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর অর্থ আল্লাহর কাছে সাহায্য, হেদায়েত ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। এটি নামাজে বান্দার বিনয় ও নির্ভরতার প্রকাশ।
হানাফি ব্যতীত অন্যান্য মাজহাবে বিতর নামাজ এক রাকাত হিসেবেও আদায় করা যায় এবং দোয়া কুনুত রুকুর আগে বা পরে পড়া জায়েজ। তবে সব মাজহাবেই বিতর নামাজের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব অভিন্ন।
বিতর নামাজ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে কোরআনের অনুসারীরা, বিতর পড়ো, কেননা আল্লাহ বেজোড় এবং বেজোড়কে ভালোবাসেন। (তিরমিজি)
বিতর নামাজ গুনাহ মাফের মাধ্যম, দোয়া কবুলের উপলক্ষ এবং ঈমানকে সুদৃঢ় করার সহায়ক।
বিতর নামাজে, বিশেষ করে দোয়া কুনুতে, দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করা যায়। ব্যক্তিগত সমস্যা, সমাজের শান্তি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
যে ব্যক্তি নিয়মিত বিতর নামাজ আদায় করে, তার ঈমানের দৃঢ়তা ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। এটি একজন মুমিনের রাতের ইবাদতকে পূর্ণতা দান করে।
বিতর নামাজ ইসলামী ইবাদতের এক অপরিহার্য অংশ। এটি দিনের শেষ ইবাদত হিসেবে আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণের অনন্য দৃষ্টান্ত। নিয়মিত ও যত্নসহকারে বিতর নামাজ আদায় করলে বান্দা আল্লাহর রহমত ও নৈকট্য লাভে ধন্য হয়। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত বিতর নামাজের নিয়ম জানা এবং তা আমলে আনা।
জেএইচআর