ধর্ম ডেস্ক
ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫, ০৬:১২ পিএম
ইসলামে ফরজ ও ওয়াজিব ইবাদতের পাশাপাশি কিছু নফল ইবাদত রয়েছে, যা আল্লাহর নৈকট্য লাভে বিশেষ সহায়ক। তাহাজ্জুদ নামাজ তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ নফল নামাজ। এটি এমন এক ইবাদত, যা বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে আরও গভীর করে, অন্তরকে প্রশান্ত করে এবং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।
তাহাজ্জুদ হলো রাতের শেষভাগে আদায়কৃত একটি নফল নামাজ। ‘তাহাজ্জুদ’ শব্দের অর্থ, ঘুম ভেঙে ওঠা। অর্থাৎ রাতে কিছু সময় ঘুমানোর পর জেগে উঠে যে নামাজ আদায় করা হয়, সেটিই তাহাজ্জুদ নামাজ। এ নামাজের সময় একান্ত নির্জনতা ও নীরবতা থাকে, যা ইবাদতে মনোযোগ ও একাগ্রতা বাড়াতে সহায়ক।
তাহাজ্জুদ নামাজের সময় শুরু হয় এশার নামাজ আদায়ের পর থেকে ফজরের নামাজের আগ পর্যন্ত। তবে সর্বোত্তম সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। হাদিসে এসেছে, রাতের শেষ ভাগে আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আছে আমার কাছে দোয়া করবে, আমি তার দোয়া কবুল করব? (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। এই সময়ে আদায় করা তাহাজ্জুদ নামাজ সবচেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ।
তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কঠোর নিয়ম নেই, তবে কিছু সুন্নাহ ও আদব অনুসরণ করা উত্তম,
নিয়ত করা: মনেপ্রাণে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার নিয়ত করতে হবে। মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়।
অজু করা: পবিত্রতা ইবাদতের শর্ত। তাই ভালোভাবে অজু করে নেওয়া আবশ্যক।
দুই রাকাত করে পড়া: তাহাজ্জুদ নামাজ সাধারণত দুই রাকাত করে পড়া হয়। সর্বনিম্ন দুই রাকাত এবং সর্বোচ্চ আট, দশ বা বারো রাকাত পর্যন্ত পড়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণত আট রাকাত তাহাজ্জুদ এবং পরে তিন রাকাত বিতর আদায় করতেন।
ক্বিরাত দীর্ঘ করা: তাহাজ্জুদ নামাজে ক্বিরাত, রুকু ও সিজদা তুলনামূলক দীর্ঘ করা সুন্নাহ। কোরআনের আয়াত ধীরে ধীরে অর্থ বুঝে পড়া উত্তম।
একান্ত দোয়া করা: নামাজ শেষে নিজের ভাষায়, নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী আল্লাহর কাছে দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দোয়া কবুলের বিশেষ সময়।
তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে বহু বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেন, রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করো, এটা তোমার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায়, তোমার প্রতিপালক তোমাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছে দেবেন। (সুরা বনি ইসরাইল: ৭৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ। (সহিহ মুসলিম)
এই নামাজ মানুষের গুনাহ মাফের মাধ্যম, দোয়া কবুলের পথ এবং অন্তরের প্রশান্তির উৎস।
তাহাজ্জুদ নামাজ কেবল ইবাদতই নয়, এটি আত্মগঠনের এক অনন্য মাধ্যম। যারা নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করেন, তাদের মধ্যে ধৈর্য, আত্মসংযম ও আল্লাহভীতি বৃদ্ধি পায়। দুনিয়ার মোহ ও অহংকার কমে যায় এবং মানুষ সৎ পথে চলতে উৎসাহিত হয়।
মানসিক চাপ, হতাশা ও অস্থিরতা দূর করতেও তাহাজ্জুদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নীরব রাতে সিজদায় মাথা রেখে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করলে অন্তর হালকা হয়, মন প্রশান্ত হয়।
তাহাজ্জুদ নিয়মিত আদায় করতে চাইলে প্রথমে অল্প রাকাত দিয়ে শুরু করা উত্তম। এশার পর দ্রুত ঘুমানো, ঘুমের আগে নিয়ত করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া খুব কার্যকর। ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হয়।
তাহাজ্জুদ নামাজ হলো মুমিন জীবনের এক বিশেষ সৌন্দর্য। এটি আল্লাহর সঙ্গে বান্দার গোপন সম্পর্কের প্রতীক। দুনিয়ার ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে দূরে, রাতের নিস্তব্ধতায় আল্লাহর দরবারে দাঁড়ানো, এর চেয়ে সৌভাগ্যের বিষয় আর কী হতে পারে। যারা আল্লাহর নৈকট্য, দোয়া কবুল এবং আত্মশুদ্ধি কামনা করেন, তাদের জন্য তাহাজ্জুদ নামাজ এক অমূল্য সুযোগ।
জেএইচআর