রুহেল হাশেমী
অক্টোবর ১৫, ২০২৫, ০৪:২৫ পিএম
বাংলাদেশের নদীমাতৃক জীবনের প্রাণশক্তি হলো নৌপথ। এই নৌপথের মাধ্যমে প্রতিদিন কোটি মানুষ যাতায়াত করছে, পণ্য পরিবহন হচ্ছে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে। কিন্তু নিরাপদ ও টেকসই নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে যে প্রতিষ্ঠানটি নিরলসভাবে কাজ করছে, সেটি হলো বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।
চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফার নেতৃত্বে এই সংস্থা বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা ও যাত্রীসেবা আধুনিকায়নের মাধ্যমে এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে।
নৌ চলাচলের আধুনিকীকরণ, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নদী বন্দরের সম্প্রসারণ এবং পরিবহন নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভূমিকা পালন করছেন।
১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিআইডব্লিউটিএ বাংলাদেশের নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রক ও উন্নয়নকারী সংস্থা। এটি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যার কাজ দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলোকে সচল ও নিরাপদ রাখা।
বিআইডব্লিউটিএর কার্যক্রম বর্তমানে ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৪টি নদী-বন্দর ও ৪৬৪টি ঘাট-পয়েন্ট জুড়ে বিস্তৃত। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, চাঁদপুর, ভোলা, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে সংস্থাটির কার্যক্রম ও দপ্তর।
বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, “বাংলাদেশের নদীই আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। আমরা চাই নৌপথকে এমন এক টেকসই পরিবহন নেটওয়ার্কে রূপ দিতে, যেখানে নিরাপত্তা, দক্ষতা ও আধুনিকতা একসাথে থাকবে।”
বিআইডব্লিউটিএ দেশের প্রধান ৫৪টি অভ্যন্তরীণ নৌপথ উন্নয়নে কাজ করছে। এসব নৌপথে ড্রেজিং, বাঁধ নির্মাণ, নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও নতুন টার্মিনাল স্থাপন করা হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরে সংস্থাটি প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার নৌপথে ড্রেজিং কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন অচল থাকা নদী ও উপ-নদীগুলোকে আবারও সচল করা হচ্ছে, যা পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় দুই কমাচ্ছে।
বাংলাদেশে নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা এখন প্রায় ১৬ হাজার। এসব নৌযানের নিবন্ধন, অনুমোদন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট প্রদান করে নৌপরিবহন অধিদপ্তর।
সংস্থাটির মেরিন সার্ভেয়িং শাখা প্রতিটি যানের নকশা, কাঠামো, যন্ত্রপাতি, যাত্রী ধারণক্ষমতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই করে অনুমোদন দেয়।
এছাড়া প্রতিবছর নৌযানের ফিটনেস টেস্ট ও বিশেষ পরিদর্শন অভিযান পরিচালনা করা হয়, বিশেষ করে ঈদ ও উৎসব মৌসুমে যখন নৌ চলাচল বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে অতীতে ঘনঘন নৌ দুর্ঘটনার কারণে শত শত প্রাণহানি ঘটেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিআইডব্লিউটিএর সক্রিয় পদক্ষেপে এই দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে এসেছে।
কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা জানান, “আমরা এখন ‘প্রতিরোধমূলক মনিটরিং সিস্টেম’ চালু করেছি। এতে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পর্যবেক্ষণ টিম কাজ করছে, তারা যানের গতিবিধি, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও নিরাপত্তা নিয়ম লঙ্ঘন হচ্ছে কি না, তা নজরদারি করে।”
বাংলাদেশের মোট অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের প্রায় ২৫ শতাংশ নৌপথে হয়। বিআইডব্লিউটিএ এই খাতের দক্ষতা বাড়াতে আধুনিক নদীবন্দর, টার্মিনাল ও ওয়াটার বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
ঢাকা নদী বন্দরে চালু হওয়া “স্মার্ট টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা” এখন যাত্রীদের ডিজিটাল টিকিটিং, সিসিটিভি নিরাপত্তা, ও শৌচাগার সুবিধা দিচ্ছে।
বরিশাল ও চট্টগ্রাম নদী বন্দরে চলছে নতুন জেটি ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সিস্টেমের কাজ, যা শেষ হলে নৌপথে রপ্তানি পণ্যের পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা চাই নৌপথকে এমন এক বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত করতে, যা সড়ক ও রেলপথের ওপর চাপ কমাবে এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তুলবে।”
বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা তাদের পদমর্যাদা ও বিভাগ অনুযায়ী নৌ প্রশাসনের বিভিন্ন দিক তদারকি করেন। সাধারণত তাদের কাজের ক্ষেত্রগুলো হলো, নৌপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি, নৌযানের ফিটনেস ও নিরাপত্তা পরীক্ষা, ড্রেজিং ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, দুর্ঘটনা তদন্ত ও প্রতিবেদন তৈরি ও নীতিমালা বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান।
বিআইডব্লিউটিএর এক সিনিয়র অফিসার বলেন, “আমরা শুধু কাগজে-কলমে কাজ করি না, মাঠে নেমে দেখি নদী কতটা নাব্য, কোথায় ড্রেজিং দরকার, কোথায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি সবকিছু নজরে রাখি।”
নদীর নাব্যতা বজায় রাখার পাশাপাশি নদীদূষণ ও দখল প্রতিরোধেও বিআইডব্লিউটিএর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সংস্থাটি নিয়মিত অভিযান চালিয়ে নদী দখলমুক্তকরণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও নদীতীরে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিগত কয়েক বছরের জোরালো প্রচেষ্টায় পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ইতোমধ্যে ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও কর্ণফুলী নদীর তীর থেকে ১,১৬৮ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ এখন প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনে রূপ নিচ্ছে। নৌযান পর্যবেক্ষণের জন্য ভেসেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (VTS), ই-রেজিস্ট্রেশন, এবং ডিজিটাল পারমিট ইস্যু প্ল্যাটফর্ম চালু করা হচ্ছে।
আগামী তিন বছরে সংস্থার লক্ষ্য, বর্ষা মৌসুমে ৭,৮৫০ ও শুষ্ক মৌসুমে ৬,২০০ কিলোমিটার নতুন নৌপথ সচল করা, ২০টি নতুন টার্মিনাল স্থাপন, ১,০০০ নৌযানে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ডিভাইস সংযোজন ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করা।
চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, “বিআইডব্লিউটিএ শুধু একটি সংস্থা নয়, এটি দেশের নদীভিত্তিক অর্থনীতির হৃদস্পন্দন। আমরা চাই নদী আবার তার পুরনো প্রাণ ফিরে পাক।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংস্থাটির সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত বালু উত্তোলন, নৌযান মালিকদের অনিয়ম এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি।
তবুও বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা আশাবাদী। তাদের বিশ্বাস, আধুনিক নীতিমালা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন চালু থাকলে বাংলাদেশ আবারও নদীভিত্তিক উন্নয়নের মডেল হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের নদীপথ শুধু ইতিহাস নয়, অর্থনীতির রক্তস্রোত। বিআইডব্লিউটিএর নিরলস প্রচেষ্টায় সেই নদীপথ এখন আবারও জেগে উঠছে।
নৌ নিরাপত্তা, অবকাঠামো, পরিবেশ ও জনসেবার সমন্বয়ে সংস্থাটি এখন এক আধুনিক ও দক্ষ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফার নেতৃত্বে কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথ আগামী দশকে হবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নিরাপদ ও সমৃদ্ধ নৌ নেটওয়ার্ক।
ইএইচ