ক্রীড়া প্রতিবেদক
এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম
ফুটবলকে যারা ধর্ম মনে করেন, সেই ব্রাজিলিয়ানদের মনে এখন উৎসবের বদলে বিষাদের সুর। ২০২৬ বিশ্বকাপ দোরগোড়ায় কড়া নাড়লেও পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের দেশ এখন দ্বিধাবিভক্ত। আর এই বিভক্তির কেন্দ্রে রয়েছেন দেশটির ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড নেইমার জুনিয়র।
সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর জরিপ বলছে, ঘরের মাঠেই নেইমারের গ্রহণযোগ্যতা এখন তলানিতে, আর দল নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা নেমে গেছে শূন্যের কোঠায়।
ব্রাজিলের নামী গবেষণা সংস্থা ‘জেনিয়াল/কুয়েস্ট’ সম্প্রতি ফুটবল ভক্তদের মনোভাব বুঝতে একটি বৃহৎ পরিসরে জরিপ চালিয়েছে। সেই জরিপের ফলাফল ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। দেখা গেছে, ব্রাজিলের ‘৪৫ শতাংশ মানুষই চান না নেইমার আগামী বিশ্বকাপে জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামুন।‘পক্ষান্তরে, তাকে স্কোয়াডে রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৭ শতাংশ। মাত্র ২ শতাংশের ব্যবধানে নেইমার তার নিজের দেশেই এখন এক ‘বিতর্কিত’ চরিত্রে পরিণত হয়েছেন।

দীর্ঘদিন চোটের সঙ্গে যুদ্ধ করা এই সান্তোস তারকাকে ঘিরে ব্রাজিলিয়ানদের এই অনীহা মূলত তার ফিটনেস এবং বড় আসরে ধারাবাহিক ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে ২০১৩ সালের পর থেকে জাতীয় দলে তার অনিয়মিত উপস্থিতি এবং ২০২৫ সালে সান্তোসে ফেরার পর আশানুরূপ পারফরম্যান্স করতে না পারা ভক্তদের ধৈর্য্য চ্যুতি ঘটিয়েছে।
ব্রাজিল মানেই হেক্সা বা ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন। কিন্তু ২০২৬ আসর নিয়ে যেন ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি সাম্বা নৃত্যের দেশটি। জরিপে অংশ নেওয়া ‘৬৮ শতাংশ ব্রাজিলিয়ান স্পষ্ট জানিয়েছেন, এবার ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জেতার কোনো সম্ভাবনা নেই।‘এটি জেনিয়াল/কুয়েস্টের জরিপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ নেতিবাচক হার।
ফুটবল নিয়ে এই চরম অনীহার চিত্র আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, ৫৪ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন বিশ্বকাপ নিয়ে তাদের মনে কোনো ‘উত্তেজনা নেই’।মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ এবারের আসর নিয়ে রোমাঞ্চিত। অর্থাৎ, খোদ ব্রাজিলেই ফুটবল এখন আর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আবেগের খোরাক হয়ে উঠতে পারছে না।
ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তি এখন ব্রাজিলের ডাগআউটে। কিন্তু তার জাদুর কাঠিতেও খুব একটা আশ্বস্ত হতে পারছেন না ভক্তরা। এখন পর্যন্ত তার অধীনে ১০ ম্যাচে ব্রাজিলের জয়ের হার মাত্র ৫৬ শতাংশ। আনচেলত্তির পারফরম্যান্সে খুশি ৪১ শতাংশ মানুষ, কিন্তু ২৯ শতাংশই তার ওপর নাখোশ।
আগামী ‘১৮ মে ঘোষিত হবে ব্রাজিলের চূড়ান্ত বিশ্বকাপ স্কোয়াড। আনচেলত্তির সামনে এখন হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ তিনি কি অভিজ্ঞ নেইমারের ওপর ভরসা রাখবেন, নাকি তরুণ তুর্কিদের নিয়ে নতুন পথে হাঁটবেন? উল্লেখ্য, বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিল আর কোনো ম্যাচ খেলছে না। ফলে নেইমারের জন্য নিজেকে প্রমাণের একমাত্র মঞ্চ এখন ক্লাব ফুটবলের ৯টি ম্যাচ।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, নেইমারকে নিয়ে এই বিভক্তি কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং ভৌগোলিক। ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চলে নেইমার বিরোধী মনোভাব তীব্র হলেও উত্তর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তিনি এখনও জনপ্রিয়। আবার নিম্ন আয়ের মানুষের চেয়ে উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যে নেইমারকে দলে রাখার প্রতি সমর্থন কিছুটা বেশি দেখা গেছে। সাও পাওলোর মতো বড় শহরে নেইমারকে নিয়ে লড়াইটা চলছে সমানে সমান।
৩৪ বছর বয়সী নেইমারের ক্যারিয়ার এখন খাদের কিনারে। চোট প্রবণতা আর ফিটনেস নিয়ে লড়াই করতে করতে তিনি এখন ক্লান্ত। সান্তোসের হয়ে চলতি বছরে ৮ ম্যাচে তার পারফরম্যান্স খুব একটা আহামরি নয়। নির্বাচক কমিটির নজর কাড়তে হলে আসন্ন ফ্লুমিনেন্স, বাহিয়া এবং পালমেইরাসের বিপক্ষে ম্যাচে তাকে অতিমানবীয় কিছু করে দেখাতে হবে।
২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল খেলবে ‘সি’ গ্রুপে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ মরক্কো, হাইতি ও স্কটল্যান্ড। ১৩ জুন নিউ জার্সিতে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে ব্রাজিলের মিশন।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন হলুদ জার্সিধারীরা মাঠে নামবে, ১০ নম্বর জার্সিতে কি নেইমারকে দেখা যাবে? নাকি ৪৭ শতাংশের স্বপ্নকে চুরমার করে ৪৫ শতাংশের আশঙ্কাই সত্যি হবে? ১৮ মে’র আগে এর উত্তর পাওয়া অসম্ভব। তবে আপাতত এটুকুই নিশ্চিত, ব্রাজিলিয়ানদের ফুটবল আবেগ এখন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এএন