Amar Sangbad
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৪,

৯ মাসে নিষ্পত্তি ১০ লাখ

আদালতে মামলাজট কমাতে মহাপরিকল্পনা

শরিফ রুবেল

নভেম্বর ২৯, ২০২২, ০১:০৪ এএম


আদালতে মামলাজট কমাতে মহাপরিকল্পনা

মামলা নিষ্পত্তিতে গতি বেড়েছে। অতীতে এত অল্প সময়ে কখনোই এত বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। বলতে গেলে ৯ মাসে মামলা নিষ্পত্তিতে ইতিহাস গড়েছে বিচারবিভাগ। সম্প্রতি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতির প্রয়োগ বাড়ছে। কমছে মামলাজট।

এতে প্রধান ভূমিকা রাখছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে নবগঠিত মনিটরিং কমিটি। বর্তমানে মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই বিচারবিভাগে নানা সংকট চলছে। নানা চেষ্টার পরও মামলাজট কমানো সম্ভব হয়নি। বিচারক সংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে মামলা হলেই বিচারকাজ আটকে যেত।

নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত, সব জায়গায়ই ছিল ভয়াবহ জট। কিন্তু মনিটরিং কমিটি গঠনের পর বিচারপতিরা সারা দেশের অধস্তন আদালতগুলো পরিদর্শন করছেন। সুফলও মিলছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশের অধস্তন আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ১০ লাখ ৭২ হাজার ২৪৮টি মামলা। ১১ লাখ ৯ হাজার ৫৩৯টি মামলার মধ্যে এই নিষ্পত্তি হয়েছে।

চলতি বছরকে ‘মামলাজট নিষ্পত্তির বছর’ হিসেবে ঘোষণা করে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিচারক ও এজলাসের সংখ্যা বাড়ানো, আদালতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জনবল বৃদ্ধি, আইনের পুনর্বিবেচনা, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, মামলা ব্যবস্থাপনা ও বিচার প্রশাসনে তদারকি বাড়ানো এবং সেকেলের আইনের বিশ্লেষণ হয়েছে। এর ফলে গেল ৯ মাসেই সাফল্য এসেছে বলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের পরিসংখ্যান মতে, অধস্তন আদালতে এ বছরের প্রথম তিন মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মামলা নিষ্পত্তির হার ছিল শতকরা ৮৫ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তী তিন মাস অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তা বেড়ে শতকরা ১০১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আর সবশেষ তিন মাস তথা জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে শতকরা ১০৫ শতাংশে। তবে ফৌজদারি মামলার চেয়ে দেওয়ানি মামলা বেশি নিষ্পত্তি হয়েছে।

আর সব বিভাগের মধ্যে নিষ্পত্তির হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। এদিকে এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অধস্তন আদালতে সর্বমোট দুই লাখ ৬৮ হাজার ৯৩৫টি দেওয়ানি মামলা দায়ের হয়েছে। আর নিষ্পত্তি হয়েছে দুই লাখ ৭৪ হাজার ৪৯৯টি দেওয়ানি মামলা। এ সময়কালে দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তির হার শতকরা ১০২ শতাংশ।

একই মেয়াদে ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছে আট লাখ ৪০ হাজার ৬০৪টি। আর নিষ্পত্তি হয়েছে সাত লাখ ৯৭ হাজার ৭৪৯টি। ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তির হার শতকরা ৯৫ শতাংশ।

অন্যদিকে হাইকোর্ট বিভাগে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট দায়ের হয়েছে ৬৪ হাজার ৬৪১টি মামলা। আর নিষ্পত্তি হয়েছে ৫০ হাজার ৯১০টি মামলা। হাইকোর্ট বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির হার শতকরা ৭৯ শতাংশ।

সূত্র জানায়, মনিটরিং কমিটি গঠনের পর কমিটির সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধায়ন, নিরবচ্ছিন্ন মনিটরিং এবং গতিশীল নেতৃত্বে মামলা নিষ্পত্তির হার বেড়েছে। মনিটরিং কমিটি গঠনের ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। মনিটরিং কমিটি গঠনের আগে ২০২১ সালের প্রথম ৬ মাসে নিষ্পত্তির শতকরা গড় হার ছিল ৫৯.৫০।

তবে চলতি বছর মনিটরিং কমিটির নেতৃত্বে মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির শতকরা গড় হার ৯১.৯০। ফলে গত বছরের তুলনায় নিষ্পত্তির শতকরা গড় হার বেড়েছে ৩২.৪০। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, মনিটরিং কমিটি গঠনের পর কমিটির সভাপতিরা বিভিন্ন সময়ে দেশের আট বিভাগের অধস্তন আদালতগুলোতে সরেজমিন পরিদর্শন করেন।

এছাড়া মামলাজট নিরসনসহ আদালতের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানকল্পে যুগোপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্দেশ্যে মনিটরিং কমিটির সভাপতিরা বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিজ নিজ অধস্তন আদালতসমূহের বিচারকদের সাথে জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে মতবিনিময় সভা করেছেন।

পাশাপাশি বিচারকাজের সুবিধার্থে দেশের সব আদালতের বিচারকদের অনলাইন রেফারেন্স সংক্রান্ত ওয়েবসাইটের অ্যাক্সেসের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান মনিটরিং কমিটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পুরাতন মামলা নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা দিয়েছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেন, মনিটরিং কমিটির বিচারপতিরা বিভিন্ন জেলার আদালতগুলো পরিদর্শন করেছেন। চলতি বছর সুপ্রিম কোর্টের দুটি অবকাশের সময় হাইকোর্ট বিভাগের ২২ জন বিচারপতি অধস্তন আদালতের বিচারকাজ তথা মামলা নিষ্পত্তিতে গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশের ৫১টি জেলা ও দায়রা জজ ও মহানগর দায়রা আদালত পরিদর্শন করেন। প্রধান বিচারপতি নিজেও খুলনা, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার আদালত পরিদর্শনে যান। এজন্য মামলা নিষ্পত্তিতে অনেক সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, আমরাও চাই আদালতে মামলাজট কমে আসুক। তবে বিচারপতিরা বিভাগ ধরে ধরে অধস্তন আদালতগুলোতে সফর করায় নিষ্পত্তিতে গতি বেড়েছে। যেটা সবশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। যে কারণে মামলাজট বাড়ে সেগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হলে প্রধান বিচারপতির উদ্যোগ সফল হবে। এতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমবে এবং আদালতের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে।

জানা গেছে, জেলার মধ্যে সব চেয়ে বেশি নিষ্পত্তি গাজীপুরে। এ মেয়াদে বিভাগভিত্তিক নিষ্পত্তিতে ঢাকা বিভাগ সব থেকে এগিয়ে আছে। এ বিভাগের নিষ্পত্তির হার শতকরা ১৩০ শতাংশ। আর জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিষ্পত্তি হয়েছে গাজীপুরে শতকরা ১৬৫ শতাংশ। শতভাগের বেশি মামলা নিষ্পত্তি হওয়া জেলাগুলোর মধ্যে ঢাকায় শতকরা ১৪৯ শতাংশ, নারায়ণগঞ্জে ১৬৩, মানিকগঞ্জে ১১২, কিশোরগঞ্জে ১০৯, গোপালগঞ্জে ১১৫, শরীয়তপুরে ১০৩, রাজবাড়ীতে ১৩৬, মাদারীপুরে ১২১, রাঙামাটিতে ১১৫, নোয়াখালীতে ১০৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৫১, নওগাঁয় ১৪২, পাবনায় ১০৪, খুলনায় ১০৪, বাগেরহাটে ১৩৫, কুষ্টিয়ায় ১০৫, সাতক্ষীরায় ১০৪, চুয়াডাঙ্গায় ১১১, নড়াইলে ১৪২, বরিশালে ১০৪, ভোলায় ১০০.৮১, পিরোজপুরে ১১৩, বরগুনায় ১১০, রংপুরে ১১৬, দিনাজপুরে ১১৪, ময়মনসিংহে ১২২, জামালপুরে ১৩৬, শেরপুরে ১০৩ ও নেত্রকোনায় ১২০ শতাংশ।

বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর অধস্তন আদালত মনিটরিংয়ের জন্য প্রতিটি বিভাগে একজন করে উচ্চ আদালতের বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে দেন। এরপর অধস্তন আদালতে মামলা নিষ্পত্তির হার বেড়েছে।

সমপ্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেছেন, প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আমি দেশের প্রতিটি বিভাগের অধস্তন আদালত মনিটরিংয়ের জন্য হাইকোর্ট বিভাগের একজন করে বিচারপতিকে দায়িত্ব দিয়ে মনিটরিং কমিটি ফর সাবঅর্ডিনেট কোর্টস গঠন করি। দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিরবচ্ছিন্ন তৎপরতা এবং প্রদত্ত দিকনির্দেশনা ও পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা নিষ্পত্তির গতি ইতোমধ্যে অনেকটাই বেড়েছে।

প্রসঙ্গত, নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা মামলার বিচার দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করার উদ্যোগ নেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের পরপরই দেশের সব আদালতে দীর্ঘ সময় ধরে অনিষ্পন্ন থাকা মামলার বিচার শেষ করতে উদ্যোগ নেন তিনি। এ লক্ষ্যে হাইকোর্ট বিভাগের আটজন বিচারপতিকে দেশের আটটি বিভাগে নিষ্পত্তি না হওয়া মামলা মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। কমিটির ঢাকা বিভাগের অধস্তন আদালতসমূহের দায়িত্ব পান বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম। খুলনা বিভাগের দায়িত্বে বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।

বরিশাল বিভাগের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় বিচারপতি জাফর আহমেদকে। মনিটরিং কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব পান বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লা, সিলেট বিভাগের মনিটরিং কমিটির দায়িত্বে রয়েছেন বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান, রংপুর বিভাগের দায়িত্বে আছেন বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন, ময়মনসিংহ বিভাগের দায়িত্ব পেয়েছেন বিচারপতি মো. জাকির হোসেন এবং রাজশাহী বিভাগের মনিটরিং কমিটির দায়িত্ব পালন করছেন বিচারপতি মো. আখতারুজ্জামান।

Link copied!