Amar Sangbad
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯

বাংলাদেশ ব্যাংক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে প্রশ্ন

ক্ষমতা খর্বে ইডিরা ক্ষুব্ধ

রেদওয়ানুল হক

জানুয়ারি ১৯, ২০২৩, ০২:১৮ পিএম


ক্ষমতা খর্বে ইডিরা ক্ষুব্ধ
  • কিছু ক্ষেত্রে কমানো হয়েছে ইডিদের নোট ইস্যুর ক্ষমতা
  • ইডি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াত ভাতা ও ওভারটাইম কর্তন
  • ব্যয় সংকোচনের নামে গরিব ঠকানো ও ইডিদের কোণঠাসা করার কৌশল —বলছেন ক্ষুব্ধ ইডিরা

‘স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদ নির্বাহী পরিচালক। এর ঊর্ধ্বে আছেন গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর— এগুলো সরকারি পদ। স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবশ্যই নির্বাহী পরিচালকদের ক্ষমতা সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু দিন দিন ডেপুটি গভর্নরদের ক্ষমতা বাড়ছে, বিপরীতে কমানো হচ্ছে নির্বাহী পরিচালকদের ক্ষমতা। এখন মামুলি বিষয়েও ডেপুটি গভর্নরদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে ইডিদের।’ এমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সিনিয়র নির্বাহী পরিচালক-ইডি। 

জানা গেছে, সামপ্রতিক সময়ে ইডিদের একটি নোট ইস্যুর ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়। আগে নিজ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওভারটাইম পেমেন্ট (যাতায়াত ও ওভারটাইম ভাতা) দিতে পারতেন নির্বাহী পরিচালকরা। ডেপুটি গভর্নর আবু ফারাহ মোহাম্মদ নাসেরের আপত্তিতে এই ক্ষমতা এখন ডেপুটি গভর্নরদের হাতে দেয়া হয়েছে। ক্ষমতা পেয়েই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতা কর্তন করে দিয়েছেন ডেপুটি গভর্নররা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রের তথ্য মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসিয়াল সময় সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। সরকারি আদেশে অফিস সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে এখন ৫টা পর্যন্ত করা হয়েছে। 

কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই নির্বাহী পরিচালকরা সকাল ৮টা থেকে অফিস শুরু করেন আর শেষ করেন সন্ধ্যা ৬টার পর। ক্ষেত্রবিশেষে রাত ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত অনেকে অফিস করেন। সে হিসাবে সকালে অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা ও বিকেলে তিন থেকে চার ঘণ্টা করে অতিরিক্ত সময় অফিস করতে হয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দপ্তরে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তাই সকালে দুই ঘণ্টা ও বিকেলে দুই ঘণ্টা ওভারটাইম ধরে এ সময়ের জন্য ভাতা দেয়া হতো এতদিন। 

কর্মকর্তাদের জন্য যাতায়াত ভাতা ও কর্মচারীদের ওভারটাইম নামে ঘণ্টায় ৬৫ টাকা হিসাবে এ ভাতা দেয়া হতো। কারণ নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে যাতায়াতের জন্য অফিসের বাস ব্যবহার করতে পারেন না এসব কর্মী। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অফিসে যাতায়াত করতে হয় তাদের। সম্প্রতি ব্যয় সংকোচনের অজুহাত দেখিয়ে এ ভাতা কারো সম্পূর্ণ কর্তন আবার কারো অর্ধেক কর্তন করা হয়েছে। তবে ভাতা কর্তনের চেয়েও ইডিদের নোট ইস্যুর ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে কর্মকর্তাদের মধ্যে। 

জানা গেছে, গত ৯ নভেম্বর ইডিদের নোটে এ ধরনের পেমেন্ট অনুমোদনে আপত্তি দিয়ে মতামত দেয় ডেপুট গভর্নর-৪ আবু ফারাহ মো. নাসের। সিনিয়র ম্যানেজম্যান্ট টিমে (এমএমটি) ব্যয় সংকোচনের ক্ষমতা ডিজিদের দেয়া হয়েছে মর্মে যুক্তি উপস্থাপন করে ওভারটাইম ভাতা অনুমোদনের জন্য ইডিদের পরিবর্তে ডিজিদের অনুমোদনে বাধ্যবাধকতা আরোপ করার পক্ষে মতামত দেয়। এর প্রেক্ষিতে ওভারটাইম ভাতা অনুমোদনের ক্ষেত্রে নতুন সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধান কার্যালয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদনের ক্ষমতা ডিজিদের হাতে এবং প্রধান কার্যালয় ব্যতীত অন্য অফিসের ক্ষেত্রে অফিস প্রধানের হাতে দেয়া হয়। 

তবে ডিজিদের সরাসরি তত্ত্বাবধান না থাকায়, ইন্টারনাল অডিট ডিপার্টমেন্ট (আইইডি), গভর্নর সচিবালয়, সচিব বিভাগ, গৃহায়ণ তহবিল ফান্ড ম্যানেজমেন্ট ইউনিট (জিটি), ইইএফ ইউনিট ও বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পসমূহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী পরিচালকদের হাতেই এই ক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়া বিএফআইইউর ক্ষেত্রে সংস্থাটির প্রধান কর্মকর্তাই এ ধরনের নোট অনুমোদন করবেন।

সিনিয়র এক নির্বাহী পরিচালকের দপ্তরে দায়িত্বরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুগ্ম পরিচালক আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের অন্য সহকর্মীরা অফিসে আসেন ১০টায় চলে যান ৫টায়। কিন্তু আমরা ৮টার আগেই অফিসে উপস্থিত হই, কারণ ইডি স্যার ৮টার মধ্যেই অফিসে চলে আসেন। আবার তারা জেনেও দেরি করেন, সাধারণত ৬টার আগে কেউ যান না। কখনো ৭টা-৮টা পর্যন্তও অফিস করেন। তাই আমাদের ওই সময় পর্যন্ত থাকতে হয়। তখন অফিসের পরিবহন না থাকায় ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় বাসায় ফিরতে হয়। 

এ ছাড়া আগে আসতে হয় তাই অফিসের বাস পাওয়া যায় না। কিন্তু ঠিকই প্রতি মাসে ৬০০ টাকা করে বাস ভাড়া কেটে নেয়া হচ্ছে। একদিকে পাবলিক পরিবহনের বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে, অপরদিকে অফিস বাসের টাকাও দিতে হয়। আগে যাতায়াত ভাতা দেয়া হতো তাই সমস্যা ছিল না, এখন সেটি কেটে নেয়ার পর আমাদের মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হচ্ছে।’ 

একই বিষয়ে কথা বলেন একজন অফিস সহকারী; যারা বেসরকারিভাবে এমএলএসএস (অরনেট) পদ্ধতিতে নিয়োগ পেয়েছেন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি বলেন, ‘এমনিতেই আমরা অনেক স্বল্প বেতনে কাজ করি। আগে ওভারটাইম পেতাম তাতে কিছুটা সাশ্রয় হতো, এখন সেটি কেটে নেয়ায় আমাদের খুবই কষ্ট হচ্ছে। হঠাৎ কেন কেটে নেয়া হলো বুঝতে পারছি না। বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে যখন বেতন বাড়বে আশা করছিলাম, তখন উল্টো ভাতা কমিয়ে দেয়া হলো।’

বিষয়টি নিয়ে খুব ও হতাশা প্রকাশ করেন আরেক জ্যেষ্ঠ নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, ‘কর্মীদের ভাতা কর্তন করার বিষয়টিই ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক আছে— তা হচ্ছে, নির্বাহী পরিচালকদের নোট ইস্যুর ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছে যা বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থি। বছরের পর বছর কাজ করে নির্বাহী পরিচালক হওয়ার পর এ ধরনের অসম্মান আমাদের জন্য বিব্রতকর।  ব্যয় সংকোচনের যে কথা বলা হচ্ছে এটি একটি অজুহাত মাত্র। কারণ যে কেউ বুঝতে পারবে এখান থেকে কত টাকা সাশ্রয় হবে।’ 

তিনি  উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের অপচয় করা হচ্ছে এমন অনেক খাত রয়েছে, সেগুলোতে হাত দেয়া হয়নি। মূলত নতুন গভর্নর আসার পর ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চার ডেপুটি গভর্নরকে নিয়েই তিনি কাজ করতে আগ্রহী। অথচ ডেপুটি গভর্নরের পদটি সরকারি; এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের সাথে জড়িত নয়। নির্বাহী পরিচালকদের ক্ষমতায় এভাবে কমতে থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংককে একসময় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বলার সুযোগ থাকবে না। কেউ এটিকে নির্বাহী পরিচালকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার অজুহাত হিসেবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে, তারা খেয়াল করছে না এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থি।’

অন্য এক নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘ব্যয় সংকোচনের নামে এখানে যা হয়েছে তা হল এডিদের শায়েস্তা করা আর গরিব মারার ফন্দি। নয়তো ভাতা কর্তনের নামে বাংলাদেশ ব্যাংক কত টাকা সাশ্রয় করল! পরিমাণ বিবেচনায় এটি কোনো টাকাই না। অথচ অফিস সময়ে ভাইভা নেয়াসহ বিভিন্নভাবে তারা টাকা নিচ্ছেন, সেখানে নজর নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যখন বাংলাদেশ ব্যাংকে আমলা গভর্নর নিয়োগ দেয়ার বিষয়ে সমালোচনা হচ্ছিল তখন এ ধরনের খবর খুবই হতাশাজনক। 

গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়া এবং সরকারি ব্যাংক বা অন্য কর্মকর্তাদের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার নীতির সমালোচনা অনেক আগে থেকেই জোরালো হচ্ছিল। এর মধ্যেই নির্বাহী পরিচালকদের ক্ষমতা সংকোচনের এ নীতি সবার আশঙ্কার প্রতিফলন ঘটেছে। 

এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতো একটি সরকারি অফিসে পরিণত হবে; তার নিজস্ব কোনো স্বকীয়তা থাকবে না। ফলে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটতে পারে। তারা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করলে এর খেসারত দিতে হবে পুরো আর্থিক খাতকে। তাই নির্বাহী পরিচালকদের ক্ষমতা খর্ব করার নীতি থেকে দ্রুত সরে আসা উচিত।

টিএইচ

Link copied!