Amar Sangbad
ঢাকা শনিবার, ১০ জুন, ২০২৩, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০

দেড় দশকেরও বেশি ক্ষমতার বাইরে বিএনপি

ভাঙন এড়াতে বার্তা

আবদুর রহিম

মার্চ ২, ২০২৩, ১০:২৭ এএম


ভাঙন এড়াতে বার্তা

সরকারের দরদ ও নেতৃত্ব নিয়ে ফাঁদ বুঝতে পারি

—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

 

নেতাকর্মীরা সতর্ক রয়েছে সংকট মোকাবিলায়  

—আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী

 

চলমান আন্দোলনে দুঃসময় কাটতে পারে

—ড. বদিউল আলম মজুমদার

  •  খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে দলে ফাটল ধরাতে নতুন ফাঁদ দেখছে বিএনপি

বিএনপির দৃষ্টি এখন রাজধানী ঢাকার আন্দোলনে। তৃণমূলেও মজবুত অবস্থান সৃষ্টির চেষ্টা। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের অব্যাহত সিরিজ কর্মসূচিতে দল এখন চাঙা। প্রাণসঞ্চারে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে বিএনপিতে ফাটল ধরাতে ‘ক্ষমতাসীনদের নতুন ফাঁদ’ দেখছে দলটি।  এ কারণে আন্দোলনের পাশাপাশি নেতাকর্মীদের বার্তা দেয়া হচ্ছে— অতীতের মতো আবারও দলের মধ্যে ভাঙনের চেষ্টা চলছে।

 বিএনপি মনে করছে, তাদের আন্দোলন নস্যাৎ করতে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, বড় একটি চক্র এ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এবার খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব টার্গেট করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা একেকজন একেক বক্তব্য দিচ্ছেন। কেউ বলছেন, খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে বাধা নেই; আবার কেউ বলছেন খালেদা জিয়া পারবেন কিন্তু নির্বাচন করতে পারবেন না। এতে স্পষ্ট যে— মা-ছেলের নেতৃত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগ একটি দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাই অতীতের মতো দলে ভাঙন এড়াতে ও সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় নেতাকর্মীরা সতর্ক থাকতে বলেছে রাজপথের এই বিরোধী দলটি। 

বিএনপি নেতারা মনে করছেন, দেড় দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকলেও বিএনপিতে নেতৃত্ব নিয়ে কোনো প্রভাব পড়েনি। নেতাকর্মীরা দল ছেড়ে চলে যায়নি, খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে দলে ভাঙন তৈরি হয়নি, দল-জোটের সবাই যথেষ্ট ঐক্যবদ্ধ।

আমার সংবাদের মুখোমুখি হয়ে দলটির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, বিএনপির মিটিং-মিছিলে কাউকে ভাড়া করে আনতে হয় না, সবাই নিজ উদ্যোগে চলে আসে। কূটনীতিকরা জাতীয় স্বার্থে বিএনপির সঙ্গে এখন নিয়মিত বসছেন। বিশেষ ইঙ্গিত দিচ্ছেন। সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানতে চাচ্ছেন। হরতাল-অবরোধের মতো জনদুর্ভোগের কর্মসূচি পালন না করায় বিএনপিকে শুভদিনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। দলের নেতারা বলছেন, বিদেশিরা স্পষ্ট বলে গেছেন, এবার এমন নির্বাচন চান যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ থাকবে এবং জনগণ বলবে নির্বাচন ফেয়ার হয়েছে। তবে বিএনপি সরকার সরাতে আন্দোলন থেকে পিছু হটছে না। নির্বাচন পর্যন্ত কৌশলী আন্দোলনের ছক আঁকা হয়েছে। আগামী ১০ মাস ধাপে ধাপে আন্দোলন চলবে।

বিএনপির দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ১০ দফা ও ২৭ দফার কর্মসূচিতে লক্ষাধিক লোকের উপস্থিতির মাধ্যমে দলের ভেতরে থাকা ঘুমোট চিন্তা পরিবর্তন হয়ে গেছে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারকে ধাক্কা দেয়ার মতো কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী দিনের ক্ষমতায় যাওয়ার কথাও ভাবছে তারা। বাধ্য হবে সরকার সরে যেতে। হবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। এবার আর অতীতের মতো সরকারের ডাকে কোনো সংলাপেও বসবে না তারা। এমন শক্তিশালী মজবুত অবস্থান নষ্ট করতে আওয়ামী লীগের ‘ফাঁদ’ থেকে দলকে রক্ষা করার লড়াইও করতে হচ্ছে বিএনপিকে। 

বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী ও দলটির গতিবিধিতে চোখ রাখা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি কোনো নেতানেত্রীর দল নয়, দেশের সংকট সময়ে বিপ্লবের দলের নামই হলো বিএনপি। সাধারণ মানুষের আস্থার দল, মানুষের অধিকার নিশ্চিতেই এ দলের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। দলটির সূচনা লগ্ন থেকে অনেক বড় বড় সংকট মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আর এ সব কিছুই হয়েছে দলটির জনপ্রিয়তার কারণে। এ দেশের রাজনীতিতে কত দল কতভাবে ভেঙে শেষ হয়ে গেছে, এখনো দেখা যাচ্ছে বিএনপি ভালো আছে। অনেক দল ভাঙছে কিন্তু দুঃসময়ে এই দলের (বিএনপি) যেমন সংকট হওয়ার কথা, বিভক্তি দেখা দেয়ার কথা, সেগুলোর কিছুই নেই।

একটু দুঃসময় যাচ্ছে এই...। একটা মিটিং-মিছিলের ডাক দিলে এখনো হাজার হাজার, লাখ লাখ নেতাকর্মী রাস্তায় নেমে আসে। এ দলে খালেদা জিয়া যেমন অসম্ভব জনপ্রিয়, তেমনি তারেক রহমানও। দলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেন। দলের সাময়িক দুঃসময়ে যে সংকট যাচ্ছে সবাই যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চিন্তা করে তাহলে খুব শিগগিরই একটি বিপ্লব হয়ে যাবে। আর বিএনপিও সেই গতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর সমপ্রতি রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরের মধ্যে দেবর-ভাবির যে অমিল প্রকাশ পেয়েছে তাতে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি আরও মজবুত বলেই মনে করছেন অনেকে। জাতীয় পার্টি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার সঙ্গে থাকলেও সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত ও দলীয় শৃঙ্খলা তৈরিতে হোঁচট খাচ্ছে। দেশ পরিচালায় না থাকলেও সে তুলনায় বিএনপি অনেক ভালো রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে দলটির সূত্রগুলো থেকে।

নেতৃত্ব ও দলের চলমান বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমার সংবাদকে বলেন, ‘এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি ক্ষমতায় নেই, তবুও এ দীর্ঘ সময়ে কেউ বিএনপিকে ছেড়ে চলে যায়নি, দলে কোনো ভাঙনও তৈরি হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশনেত্রী, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসনকে অন্যায়ভাবে সাজা দেয়া হয়েছে।’ খালেদা জিয়ার কিছু হলে এই সরকারকে সব দায় বহন করতে হবে। তারুণ্যের অহঙ্কার তারেক রহমান এই সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দেশে আসতে পারছেন না। দলের এই সংকট সময়েও সব স্তরের নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন। 

বিএনপির সঙ্গে অন্য দলের জোটগুলোও এই সরকারকে সরাতে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। আমরা ১০ দফার দাবি নিয়ে আন্দোলন করছি। আশা করছি এই সরকার সরে যেতে বাধ্য হবে। এরপর আমরা ২৭ দফা মাধ্যমে দেশকে সংস্কার করতে পারব। অতীতে বিএনপির অনেক দুঃসময় গেছে, অনেক পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে কিন্তু দলের এই সংকট সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের যৌথ নেতৃত্বে সুশৃঙ্খল রয়েছে। সমপ্রতি ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মধ্যে খালেদা জিয়ার রাজনীতি নিয়ে অনেক দরদ দেখা যাচ্ছে । আসলে তার আড়ালে দলে একটি বিভক্তির চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু বিএনপি ও দলটির নেতাকর্মীরা এই ‘ফাঁদ’ খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারেন।’

সংকট-দুঃসময় মোকাবিলায় বিএনপির সব নেতাকর্মী দলের অনুগত দাবি করে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, ‘বিএনপি অতীতের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে আছে। দেশের জনগণ ও দলের নেতাকর্মীরা সবই বুঝে। দলের দুঃসময়ে, সংকট মোকাবিলায় সব নেতাকর্মী বুদ্ধিদীপ্ত ও চৌকসের পরিচয় দিয়ে যার যার অবস্থান থেকে দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। আমীর খসরু আরও বলেন, বিএনপি জনগণের রাজনীতি করে, জনগণের শক্তিতে বিএনপি বিশ্বাসী, তাই রাজনীতির এই দুঃসময়ে এই দলের প্রতি মানুষের আস্থাও অতীতের চেয়ে আরও বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ 

তিনি আরও দাবি করেন, বিএনপি অনেক শক্তিশালী দল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার নানা ‘ষড়যন্ত্র’ করে বিএনপির জনপ্রিয়তাকে মুছে ফেলতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি। আশা করি পারবেও না। খুব শিগগিরই দেশে পরিবর্তন আসবে। বিদেশিরাও সেই বার্তা দিয়ে গেছেন। তারা সমপ্রতি বলে গেছেন, জনগণের কাছে যে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য তারা সেই নির্বাচন দেখতে চান। আগামীতে অবশ্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। সেই নির্বাচনে অবশ্যই আবারও বিএনপির জনপ্রিয়তা প্রকাশ পাবে বলে মনে করেন তিনি।

বিএনপির দুঃসময় কাটতে পারে বলে মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আমার সংবাদকে বলেছেন, ‘দলীয় প্রধানের মুক্তি দাবির পাশাপাশি সরকারের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে হবে বিএনপিকে। সে ক্ষেত্রে তারা অনেক পিছিয়ে। তাদের এটিও করা উচিত। তবে সমপ্রতি তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন। তারা ২৭ দফার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলছে। এ ছাড়া তারা ১০ দফার দাবিতে কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। তাদের কর্মসূচিগুলোতে হাজার হাজার লোকের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। তবে বিএনপিতে জনগণের আস্থা অর্জনে বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন। এ নেতৃত্বকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হতে হবে। একই সাথে শ্যাডো ক্যাবিনেট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা দরকার বলেও মনে করেন এ বিশ্লেষক।’

Link copied!