নভেম্বর ২২, ২০২২, ১২:৪৯ এএম
পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের নতুন দাম ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি। পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়লেও এখনই খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ছে না। তবে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়বে কি-না যাচাই-বাচাই করবে বিইআরসি। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার দাম বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি দেবে। বিদ্যুতে প্রচুর ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। এত ভর্তুকি সরকারের পক্ষে দেয়া সম্ভব না। তা ছাড়া আইএমএফও বলেছে ঋণ পেতে হলে এসব ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে। অথচ সরকারে পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শর্ত ছাড়াই আইএমএফ ঋণ দেবে।
এদিকে বিদ্যুৎ খাতের বড় ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে বেসরকারি কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ। যে কেন্দ্রগুলোর দরকারই ছিল না এবং যেগুলোর সময় বাড়ানোরও দরকার ছিল না। রেন্টাল কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কোনো উৎপাদন না করলেও বসিয়ে রেখে ১১ বছরে তাদের প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো মুনাফা করছে। আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি না অথচ তাদের মুনাফা হচ্ছে। কারণ দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কেটে তাদের টাকা দেয়া হচ্ছে। সরকারের কাজই হলো জনগণকে বিদ্যুৎ না দিয়ে একটি গোষ্ঠীকে মুনাফা লুটতে দেয়া। ফলে ভুক্তভোগী শেষ পর্যন্ত জনগণই। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিণতিতে আবারো দেশে সব জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বাড়বে। পাইকারিতে দাম বাড়লে গ্রাহক পর্যায়েও এর প্রভাব অবশ্যই পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেড়েছে বিদ্যুতের দাম।
এর আগে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি বিদ্যুতের পাইকারি দাম পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব জমা দেয় পিডিবি। এরপর ১৮ মে তাদের প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করা হয়েছে। এরপর সবশেষ ১৩ অক্টোবর দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দেয় কমিশন। কিন্তু এক মাসের বেশি কিছু সময় পর বিইআরসি মত পরিবর্তন করে বৃদ্ধি করেছে বিদ্যুতের দাম। ভোক্তাদের আপত্তি উপেক্ষা করে বিদ্যুতের পাইকারি দর বৃদ্ধির পথ ধরেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। পাইকারি দর বাড়ানোর প্রস্তাব নাকচ করে বাহবা নেয়ার এক মাস পর নিজের অবস্থান থেকে সরে আসে বিইআরসি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা দেখছি না। তারা বলছে, এক দিকে উচ্চমূল্যের ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, অন্যদিকে সপর্ট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানিও বন্ধ— এমন প্রেক্ষিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ঠিক হয়নি। এখন পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার মানে হলো শিগগিরই খুচরা ও সঞ্চালন পর্যায়েও দাম বাড়বে। পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানো সরকারি একটি ঘুটি।
গতকাল সোমবার ভার্চুয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেয় বিইআরসি। তবে পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের আগের দামই বহাল থাকবে বলেও জানায় সংস্থাটি। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের প্রতি কিলোওয়াট পাঁচ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ছয় টাকা ২০ পয়সা নতুন দর ঘোষণা করল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি। অর্থাৎ প্রতি কিলোওয়াটে এক টাকা তিন পয়সা করে বেড়েছে। শতাংশের হিসাবে ১৯.২২ শতাংশ বেড়েছে।
এর আগে গত ১৩ অক্টোবর বিইআরসি পিডিবির আবেদনে তথ্যের অস্পষ্টতা, বিতরণ কোম্পানি ও ভোক্তাপর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিশ্লেষণ না থাকাসহ কয়েকটি কারণে দামবৃদ্ধির আবেদন খারিজ করে দেয়। গত ১৪ নভেম্বর পিডিবি ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। তার প্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার এই দাম বৃদ্ধি করে সরকার। অথচ ভোক্তাপর্যায়ে এর প্রভাব বিশ্লেষণ না করে জোর করে অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় বিধি ভেঙে এই দাম বাড়ানো হয়েছে এমনই মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।
এদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব আগে থেকেই পিডিবির বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের সমালোচনা করে আসছে। সংস্থাটি দাম না বাড়ানোর যৌক্তিক কারণ খুঁজে বের করে দিয়েছে। কিন্তু বিইআরসি কর্ণপাত না করে ভোক্তা পর্যায়ের সুবিধার কথা না ভেবে অযাচিত বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এর আগে অযৌক্তিকভাবে জ্বালানি তেলের দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। ফলে হঠাৎ করে দেশে মুদ্রাস্ফীতি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে।
পাইকারি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে ক্যাবের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম আমার সংবাদকে বলেন, ‘উচ্চমূল্যের ডিজেল-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে, একই কারণে স্পর্ট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ। এখন তো বিদ্যুতের দাম কমানো উচিত। কিন্তু অযৌক্তিকভাবে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাইকারি দাম বৃদ্ধিকে কোম্পানিগুলো ঘুটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। সাধারণত সরবরাহকৃত বিদ্যুতের পরিমাণকে বিবেচনায় নিয়ে বিতরণ কোম্পানির রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়। সরবরাহকৃত বিদ্যুতের দামের সাথে বিতরণ কোম্পানির পরিচালন ব্যয় যোগ-বিয়োগ করে খুচরা দাম নির্ধারণ করা হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দেয়ায় বিতরণ কোম্পানিগুলো রাজস্ব কমে গেছে। পাইকারি দাম বৃদ্ধি পেলে সেই সুযোগে কম উৎপাদনকে সামনে এনে বেশি করে দাম বৃদ্ধির চাইবে। যা কৌশলগতভাবে উপেক্ষা করার সুযোগ থাকবে না।
এদিকে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি গ্রাহক পর্যায়ে কোনো প্রভাব ফেলবে না জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়বে কি-না তা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) যাচাই-বাছাই করে দেখবে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এ কথা জানান। তিনি বলেন, গ্রাহক পর্যায়ে কতটুকু প্রভাব পড়বে এখন তো বলতে পারছি না। এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কারণ আমরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে চাই। দামের সাথে কিছুটা সমন্বয় করতে চাই। এখন যেটি হয়েছে, সেটি হয়তো হবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে বিইআরসি এটি বাড়ানো (গ্রাহক পর্যায়ে) বিবেচনা করবে।
জানা গেছে, এই দাম পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভর্তুকি ধরা হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ দাম বাড়ানোর পরও বিদ্যুতের উৎপাদন পর্যায়ে ভর্তুকি ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেবে সরকার। এদিকে আগামী বিল মাস ডিসেম্বর থেকেই নতুন এই মূল্য কার্যকর হবে বলেও জানিয়েছে কমিশন। গত এক যুগে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ৯ বার। এ সময় পাইকারি পর্যায়ে ১১৮ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে ৯০ শতাংশ বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। সর্বশেষ দাম বাড়ানো হয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যা ওই বছরের মার্চ থেকে কার্যকর হয়। ওই সময় পাইকারি পর্যায়ে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ বাড়ানো হয় দাম। একই সময়ে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
সর্বশেষ ২০২০ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি আরেক দফা বাড়ানো হয় বিদ্যুতের দাম। পাইকারি, খুচরা ও সঞ্চালন— এই তিন পর্যায়ে তখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট গড়ে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়িয়ে পাঁচ টাকা ১৭ পয়সা করা হয়। যা আগে ছিল প্রতি ইউনিট চার টাকা ৭৭ পয়সা। এ ছাড়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ প্রতি ইউনিটে শূন্য দশমিক ২৭৮৭ টাকা থেকে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ২৯৩৪ টাকা করা হয়ে। ওই বছরের ১ মার্চ থেকে কার্যকর করে বিইআরসি।
খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে আপাতত দাম না বাড়লেও বিদ্যুতের দাম নিয়ে শঙ্কিত ব্যবসায়ীরা। সরকার ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেয়ার পাশাপাশি বকেয়া অর্থ উত্তোলনের আহ্বান জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, মানুষের মধ্যে হাহাকার সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে উৎপাদন খাত গভীর সংকটে পড়বে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান জানান, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট বেড়েছে। বাড়তি দামেও আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে জেনারেটর দিয়ে কারখানা চালাচ্ছি। ফলে উৎপাদন খরচে দিন দিন বাড়ছে।’ তিনি বলেন, এখন নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে আমাদের উৎপাদন খরচ বাড়বে। ব্যবসার স্বার্থে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত ১৮ মে পিডিবি গণশুনানিতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৬৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় এবং বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি ভর্তুকি না দিলে ৫৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। আর ভর্তুকি দিলে বাড়ানোর প্রয়োজন নেই বলেও তারা সুপারিশ করে। পরে গত ১৩ অক্টোবর বিইআরসি পিডিবির আবেদন নানা কারণে খারিজ করে দেয়। গত ১৪ নভেম্বর পিডিবি ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুতের দাম ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করল বিইআরসি।
