ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

এমপিও শিক্ষকদের সঙ্গে বৈষম্য: ক্ষোভে ফুঁসছে শিক্ষাঙ্গন

রুহেল হাশেমী

রুহেল হাশেমী

অক্টোবর ১২, ২০২৫, ০৭:১২ এএম

এমপিও শিক্ষকদের সঙ্গে বৈষম্য: ক্ষোভে ফুঁসছে শিক্ষাঙ্গন

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়ে সরকারের আচরণে ক্ষোভে ফুঁসছে সারাদেশের শিক্ষক সমাজ। দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও শতভাগ উৎসব ভাতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু আশ্বাসের পর আশ্বাস মিললেও বাস্তবে পরিবর্তন খুবই নগণ্য। 

সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করার ঘোষণা এ যেন শিক্ষকদের ভাষায় “এক প্রকার তামাশা”।

গত ১৩ই আগস্ট ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত হয় “শিক্ষক মহাসমাবেশ ও পদযাত্রা”। 

প্রেস ক্লাব থেকে সচিবালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলে হাইকোর্ট সংলগ্ন কদম ফোয়ারা এলাকায় পুলিশি বাধার মুখে পড়েন শিক্ষকরা। অনেকেই হতাশার সুরে বলেন—“যে পেশা মানুষ তৈরি করে, সেই পেশার মানুষ আজ অবমূল্যায়িত, অবহেলিত এবং উপহাসের পাত্র।”

শিক্ষক সমাজ মনে করে, বাড়ি ভাড়া ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করার ঘোষণাটি এমন এক দিনে এসেছে, যেদিন বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছিল—যা শিক্ষক মর্যাদার পরিপন্থী এক কৌতুক বলেই তারা মনে করছেন।

‘শিক্ষকদের সঙ্গে তামাশা বন্ধ হোক’

জাতীয় শিক্ষক ফোরামের নেতারা বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে সরকারের এই আচরণ বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। তারা বলেন, “শিক্ষক সমাজের মর্যাদা রক্ষার বদলে তাদের সঙ্গে একের পর এক তামাশা করা হচ্ছে। আমরা দাবি করেছি মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া, কিন্তু সরকার দিয়েছে সাকুল্য মাত্র ৫০০ টাকা। এটা তো অপমান।”

ফেসবুক ও সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে চলছে উত্তাল আলোচনা। অনেক শিক্ষক তীর্যক মন্তব্য করে লিখেছেন—“আমরা শিক্ষাদান করি, কিন্তু শেখাই না কিভাবে সম্মান কুড়াতে হয়।” অন্যদিকে নন-এমপিও শিক্ষকরা আরও কঠোর ভাষায় বলেছেন, “আমরা একুশ শতকের শ্রম দাসে পরিণত হয়েছি।”

আগের ঘোষণার আলোকে ১২ই অক্টোবর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়

এক প্রতিবেদনে জানা যায়, শিক্ষকদের ক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে—বাড়ি ভাড়া মূল বেতনের ২০ শতাংশ, চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি, কর্মচারীদের বোনাস ৭৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে শিক্ষকরা বলছেন, “প্রস্তাব নয়, বাস্তবায়ন চাই।

দুর্বল বেতন কাঠামো

একজন সহকারী শিক্ষক চাকরিতে যোগ দেন মাত্র ১২,৫০০ টাকা মূল বেতনে। তার সঙ্গে বাড়ি ভাড়া ১,০০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা ও বিশেষ প্রণোদনা ১,০০০ টাকা যুক্ত হয়। কিন্তু এই বেতন থেকে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের নামে ১০ শতাংশ কেটে রাখা হয়। সব মিলিয়ে মাস শেষে একজন শিক্ষক হাতে পান প্রায় ১৩,৭৫০ টাকা।

কলেজ পর্যায়ে একজন প্রভাষকের মূল বেতন ২২,০০০ টাকা, যার সঙ্গে বাড়ি ভাড়া ১,০০০, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ ও প্রণোদনা ১,০০০ টাকা। এখান থেকেও ১০ শতাংশ কর্তন করা হয়, ফলে বেতন দাঁড়ায় মাত্র ২২,৩০০ টাকা।

ঢাকা বা বিভাগীয় শহরে থাকা একজন শিক্ষক ও প্রত্যন্ত গ্রামের একজন শিক্ষক একই বেতন পান—এটা শিক্ষক সমাজের কাছে এক প্রকার বৈষম্য। রাজধানীতে ভাড়া, যাতায়াত, খাদ্য, ওষুধ—সব কিছুই যেখানে আকাশচুম্বী, সেখানে এই বেতনে সংসার চালানো সত্যিই অসম্ভব।

“সব শিক্ষক প্রাইভেট পড়ান”—এই ধারণা বিভ্রান্তিকর

শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রায়ই শোনা যায়, তারা প্রাইভেট পড়িয়ে অতিরিক্ত আয় করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ শিক্ষক প্রাইভেট পড়ানোর মতো অবস্থানে নেই। ইংরেজি, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, হিসাববিজ্ঞান—এসব বিষয়ের শিক্ষকরা কিছুটা প্রাইভেট পড়াতে পারেন, কিন্তু ইতিহাস, ইসলাম শিক্ষা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা কৃষিশিক্ষার শিক্ষকরা তা পারেন না।

ফলে অনেক শিক্ষক মাস শেষে সংসার চালাতে হিমশিম খান। অনেকে বাধ্য হয়ে টিউশন ছাড়াও অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েন। এমন অবস্থায় শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

বাড়ি ভাড়া—শিক্ষকদের ক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দু

বাংলাদেশের অন্যান্য সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে বাড়ি ভাড়া সাধারণত মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ, কোথাও কোথাও ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে তা নির্দিষ্ট হারে নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে তাদের দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১,০০০ টাকা—এবার বাড়ানো হলো ৫০০ টাকা।

শিক্ষকরা বলছেন, “যেখানে পোশাক শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা, সেখানে আমরা মাস্টার্স পাস শিক্ষক হয়েও সেই একই অঙ্কে বেতন পাই—এটা কি তামাশা নয়?

বৈষম্য, প্রহসন না তামাশা?

পোশাকশিল্পের কর্মীদের নিম্নতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি বা এসএসসি পাস। অথচ একজন শিক্ষককে হতে হয় অনার্স, মাস্টার্স এমনকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। তারপরও বেতন কাঠামো এমন যে, পোশাক কর্মীদের চেয়ে তারা প্রায় সমপর্যায়ের আয় করেন।

শিক্ষকদের ভাষায়, “যে পেশা মানুষ গড়ে, সেই পেশাকে আজ অবজ্ঞা করা হচ্ছে।

সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত, পেনশন সুবিধা অনিশ্চিত, চিকিৎসা ভাতা অপ্রতুল—সব মিলিয়ে শিক্ষকতা পেশা এখন অনেকের চোখে আর আকর্ষণীয় নয়। যোগ্য তরুণেরা শিক্ষকতার পেশা এড়িয়ে অন্য দিকে ঝুঁকছেন।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষকদের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমেই বেতন কাঠামোর সংস্কার জরুরি। শিক্ষক সমাজের জন্য আলাদা “শিক্ষক কল্যাণ তহবিল”, শতভাগ উৎসব ভাতা, শতভাগ বাড়ি ভাড়া ভাতা এবং চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।

তারা বলেন, “শিক্ষক যদি মর্যাদা না পান, শিক্ষা কখনও মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে না।”

সরকারের উচিত শিক্ষক সমাজকে প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা। কেননা, আজকের শিশুদের আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক বানানোর দায়িত্ব এদের হাতেই।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে তামাশা আর কতদিন চলবে—এই প্রশ্ন এখন দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। শিক্ষকরা বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য ভিক্ষা চান না; তারা চান তাদের শ্রম, যোগ্যতা ও অবদানের স্বীকৃতি।

যে জাতি তার শিক্ষককে সম্মান দিতে জানে না, সে জাতির ভবিষ্যৎ কখনও উজ্জ্বল হয় না—এই কথাটি যেন সরকার আবারও স্মরণ করে।

ইএইচ

Link copied!