ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

ছাত্রদের কলম হোক অস্ত্র, জ্ঞান হোক শক্তি

হাশেম রেজা

হাশেম রেজা

অক্টোবর ১৩, ২০২৫, ০৩:১৬ পিএম

ছাত্রদের কলম হোক অস্ত্র, জ্ঞান হোক শক্তি

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ‘ছাত্র রাজনীতি’ একসময় ছিল আদর্শ, ত্যাগ ও নেতৃত্বের প্রতীক। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রাম— প্রতিটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে ছাত্রসমাজ ছিল অগ্রভাগে। তারা ছিল পরিবর্তনের প্রেরণা, জাতির বিবেক। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই গর্বিত ইতিহাস যেন ধীরে ধীরে কলুষিত হয়েছে। আজকের বাস্তবতায় ছাত্র রাজনীতি অনেকাংশে রূপ নিয়েছে দলীয় আনুগত্য ও সহিংসতার রাজনীতিতে— যেখানে শিক্ষা, মনন ও নৈতিকতার চর্চা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

স্বাধীনতার আগে ছাত্র রাজনীতি মানে ছিল জাতীয় স্বপ্ন ও অধিকার রক্ষার আন্দোলন। সে রাজনীতি ছিল আদর্শ ও জনগণের স্বার্থনির্ভর। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে দলীয় স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে শিক্ষাঙ্গনেও। ছাত্র সংগঠনগুলো তখন ধীরে ধীরে পরিণত হয় রাজনৈতিক দলের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনে।

যেখানে একসময় ছাত্ররা দেশের জন্য লড়ত, সেখানে এখন তাদের ব্যবহার করা হয় দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে। শিক্ষা, গবেষণা, নৈতিকতা বা চিন্তাচর্চার জায়গা দখল করে নিয়েছে আনুগত্য, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক সুবিধার লোভ। ফলাফল—ছাত্র রাজনীতি আজ প্রায়শই লাঠিয়াল রাজনীতিতে রূপ নিচ্ছে।

এখনকার বাস্তবতা অত্যন্ত স্পষ্ট। দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই দেখা যায়, ছাত্র সংগঠনগুলো দলীয় রঙে রাঙানো। ক্যাম্পাসে কারা থাকবেন, কারা হলে থাকবেন, কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হবে, এমনকি শিক্ষক নিয়োগেও দলীয় প্রভাব কাজ করছে। এসবের মধ্যেই গড়ে উঠছে এক ধরনের দমনমূলক সংস্কৃতি, যেখানে ভিন্ন মত প্রকাশ করা বা নিরপেক্ষ থাকা মানেই ঝুঁকি।

রাজনীতির মূল লক্ষ্য যেখানে হওয়া উচিত ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ, সেখানে এখন লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতা দখল ও দখল ধরে রাখা। দলগুলো তরুণদের ব্যবহার করছে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়ই পরিণত হচ্ছে রাজনৈতিক সংঘর্ষের ময়দানে, আর ছাত্ররা হচ্ছে সেই সংঘর্ষের প্রথম সারির যোদ্ধা।

জুলাই আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের ২০২৪। তৎকালীন সরকারের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য—‘আন্দোলনকারীদের মোকাবেলায় ছাত্রলীগই যথেষ্ট’ এমন বাস্তবতার প্রতিফলন। এটি নতুন কিছু নয়, ইতিহাসও এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী। গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি সময়েই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো কখনও না কখনও সরকারকে রক্ষার ভূমিকায় ব্যবহূত হয়েছে। অথচ ছাত্র সংগঠনের মূল কাজ হওয়া উচিত ছিল ছাত্রদের অধিকার ও শিক্ষার মান রক্ষা করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, চট্টগ্রাম কিংবা জাহাঙ্গীরনগর— কোন শিক্ষাঙ্গনই এ সহিংসতা থেকে মুক্ত নয়। দলীয় আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়েছে অসংখ্য তরুণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর যেখানে একজন শিক্ষার্থীর উচিত জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়া, সেখানে অনেকে জড়িয়ে পড়ছে সংঘর্ষ, দখল ও অস্ত্রের রাজনীতিতে।

এই সহিংস সংস্কৃতি শুধু শিক্ষার পরিবেশকেই নষ্ট করছে না, বরং নষ্ট করছে প্রজন্মের মনন ও নৈতিকতা। আজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার পরিবেশ সংকুচিত, ক্লাসে উপস্থিতি কম, আর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহও হ্রাস পাচ্ছে। অনেকে বিদেশে গিয়ে পড়তে চায় শুধু এই অরাজক পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে।

ছাত্র রাজনীতি মানেই দলীয় রাজনীতি নয়। বরং এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছাত্রদের নেতৃত্বগুণ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নাগরিক সচেতনতা গড়ে তোলা। রাজনীতি হলো সমাজ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া, আর তরুণরাই সেই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই শক্তিকে যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যবহার করে, তবে তা জাতির জন্য এক বিপর্যয় ছাড়া আর কিছু নয়।

একজন শিক্ষার্থীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব শিক্ষা অর্জন। রাজনীতি করতে হলে জ্ঞান, নীতি ও সচেতনতা দরকার। কিন্তু যখন রাজনীতি হয়ে ওঠে টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব ও সহিংসতার প্রতিযোগিতা, তখন তা ছাত্রদের ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দেয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের মানবসম্পদ, পিছিয়ে পড়ে জাতির উন্নয়নচক্র।

রাজনৈতিক দলগুলো জানে, তরুণরাই ভবিষ্যতের ভোটার, ভবিষ্যতের নেতা। তাই তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করাই দলীয় কৌশলের অংশ। ক্যাম্পাসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তারা ছাত্র সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক মাঠ গরম রাখতে। এভাবেই তৈরি হয় এক ধরনের নির্ভরশীল সংস্কৃতি— যেখানে ছাত্ররা দলীয় নির্দেশ ছাড়া কিছু ভাবতে পারে না।

ফলাফল একটাই—ছাত্রদের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতা নষ্ট হয়। তারা হয়ে ওঠে অন্ধ অনুসারী, যারা প্রশ্ন করে না, প্রতিবাদ করে না। অথচ প্রশ্ন করার সাহসই ছিল ছাত্র রাজনীতির প্রাথমিক ভিত্তি।

একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার শিক্ষাঙ্গন মুক্ত চিন্তা, গবেষণা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়। কিন্তু দলীয় রাজনীতির প্রভাব, দখলদারিত্ব এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব শিক্ষাঙ্গনের সেই মুক্ত পরিবেশকে ধ্বংস করছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা।
এর জন্য দরকার তিনটি পদক্ষেপ—

প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রাজনৈতিক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। শিক্ষকদের নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দলীয় বিবেচনা নয়, যোগ্যতা ও নীতির ভিত্তি থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে সংস্কার করে প্রকৃত ছাত্র নেতৃত্ব গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে দলীয় প্রভাব নয়, বরং ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে নেতৃত্ব উঠে আসে।

তৃতীয়ত, শিক্ষা অবকাঠামো ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। যখন শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও গবেষণায় আগ্রহী হবে, তখন সহিংসতা ও ক্ষমতার রাজনীতির জায়গা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে।

ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার আহ্বান যেমন অবাস্তব, তেমনি তাদের দলীয় যন্ত্রে পরিণত করাও অন্যায়। ছাত্র রাজনীতি থাকতে হবে—কিন্তু তা হতে হবে মূল্যবোধনির্ভর ও গঠনমূলক। ছাত্ররা সমাজ পরিবর্তনের শক্তি। তারা অংশ নিতে পারে সামাজিক সেবায়, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে, পরিবেশ রক্ষায় বা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে। পাঠচক্র, বিতর্ক সংগঠন বা গবেষণা গ্রুপ গড়ে তোলা যেতে পারে তরুণ নেতৃত্ব তৈরির মাধ্যম হিসেবে। ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে যদি নেতৃত্ব, সহমর্মিতা ও সততার চর্চা হয়, তবে সেটিই হবে জাতির জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু যদি সেটি পরিণত হয় অস্ত্রধারী বাহিনী তৈরির প্রকল্পে, তবে সেটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অভিশাপ।

রাজনৈতিক দল, শিক্ষক সমাজ ও প্রশাসন—সবারই এখন নতুন করে ভাবতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির নামে সহিংসতা বন্ধ করতে না পারলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। বিশ্ববিদ্যালয় হতে হবে জ্ঞানের মুক্ত ক্ষেত্র, মতের বৈচিত্র্যের স্থান।

মননশীল সমাজ গড়তে হলে তরুণদের মাঝে নীতি, যুক্তি ও মানবিকতা চর্চার সুযোগ দিতে হবে। তাদের মধ্যে নেতৃত্ব তৈরির চর্চা রাখতে হবে, কিন্তু সেই নেতৃত্ব যেন দলীয় নয়, বরং জাতীয় স্বার্থে নিবেদিত হয়। বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে এখন এক ধরনের সংকট বিদ্যমান—এ সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি নৈতিক ও মানসিকও। যে ছাত্র সমাজ একদিন জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিল, তারা আজ বিভক্ত, ব্যবহূত ও ক্লান্ত।

ছাত্ররা যদি আবারও চিন্তার স্বাধীনতা, নৈতিক শক্তি ও জনকল্যাণের রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আরও আলোকিত হবে। এ জন্য প্রয়োজন মননশীল পরিবেশ, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও দলীয় প্রভাবমুক্ত শিক্ষাঙ্গন।

ছাত্ররা ছাত্র হিসেবেই থাকুক—তাদের হাতে থাকুক বই, মনের ভেতর থাকুক স্বপ্ন। তাদের রাজনীতি হোক জ্ঞানের, সততার ও পরিবর্তনের রাজনীতি। তারা যেন আবারও জাতির বিবেক হয়ে উঠতে পারে— যেমনটা একদিন ছিল।

লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক

Link copied!