নিজস্ব প্রতিবেদক
নভেম্বর ১, ২০২৫, ০৭:০৯ পিএম
নভেম্বরের প্রথম দিনেই যেন হঠাৎ করে মৌসুমের ছন্দপতন। সারাদিন রোদ-ছায়ার লুকোচুরি শেষে বিকেলের আকাশ ঢেকে গেল ঘন কালো মেঘে। তারপর হু হু করে বয়ে গেল দমকা হাওয়া, আর মুহূর্তেই নেমে এলো মুষলধারে বৃষ্টি।
কয়েক মিনিটের মধ্যে যেন ঢাকাজুড়ে নামল অন্ধকার। পথচারীরা ছুটে গেল আশ্রয়ের খোঁজে, যানজট বাড়ল শহরের প্রায় সব প্রধান সড়কে।
শনিবার বিকাল চারটার পর থেকেই রাজধানীর আকাশে জমতে থাকে কালো মেঘ। কিছুক্ষণের মধ্যেই দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবল বেগে বয়ে আসে দমকা হাওয়া। বাতাসের সঙ্গে ছিটেফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়ে মিনিট দশেকের মধ্যে রূপ নেয় ঝুমবৃষ্টিতে।
মিরপুর, ফার্মগেট, শাহবাগ, মোহাম্মদপুর, মালিবাগ, মুগদা, উত্তরা ও ধানমন্ডি প্রায় সব এলাকাতেই ২০ থেকে ৩০ মিনিট টানা বৃষ্টিপাত হয়।
বৃষ্টির পানি জমে যায় বিভিন্ন মোড় ও অলিগলিতে। অফিস থেকে ফেরার পথে অনেককেই ছাতা ছাড়াই ভিজতে দেখা গেছে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, বিকেল পর্যন্ত তো মনে হচ্ছিল গরমই পড়বে। হঠাৎ এত অন্ধকার হয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি বৃষ্টি নামবে। অফিস থেকে বের হয়েই পুরো ভিজে গেলাম।
আবহাওয়া অফিসের সর্বশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, রাজধানীসহ দেশের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষ করে যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব অথবা পূর্বদিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টিসহ অস্থায়ীভাবে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
এ কারণে এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে নম্বর ১ (পুনঃ) ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, “আজকের বৃষ্টি মৌসুমি নয়, বরং মৌসুমান্তকালীন ঘূর্ণনপ্রবাহের প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া অস্থায়ী লঘুচাপের ফল। নভেম্বরের শুরুতে এমন বৃষ্টি অস্বাভাবিক নয়, তবে দমকা হাওয়ার বেগ কিছুটা বেশি।
আবহাওয়াবিদদের মতে, ভারতের উত্তর ছত্তিশগড় ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত একটি সুস্পষ্ট লঘুচাপ বর্তমানে উত্তর–উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-মধ্যাঞ্চলে বায়ুচাপের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
ফলে শনিবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগের কিছু কিছু স্থানে ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই লঘুচাপটি যদি বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে সক্রিয় থাকে, তাহলে নভেম্বরের শুরুতেই দ্বিতীয় দফা শীত আসার আগে কয়েকদিনের জন্য দেশের তাপমাত্রা হ্রাস পেতে পারে।
বিকাল সাড়ে চারটার দিকে ঢাকার আকাশের দৃশ্য ছিল সিনেমার মতো। মুহূর্তে সূর্যের আলো হারিয়ে যায়, আকাশে জমে কালচে ধোঁয়ার মতো মেঘ। বিদ্যুতের ঝলকানি ও বজ্রপাতের শব্দে অনেকে ভীত হয়ে পড়ে।
ধানমন্ডির এক দোকানদার বলেন, একটা সময় মনে হচ্ছিল রাত হয়ে গেছে। দোকান বন্ধ করে ফেলব কী না ভাবছিলাম, এমন সময় হাওয়ার ঝাপটা এসে সব সাইনবোর্ড কাঁপাতে লাগল।
রাস্তায় যানবাহনগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছিল। বৃষ্টির সময় শহরের বিভিন্ন অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় নেমে আসে চিরচেনা দুর্ভোগ জলাবদ্ধতা ও যানজট।
বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, রাজারবাগ ও মুগদা এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। অফিস থেকে ফেরার সময় প্রায় সব সড়কেই দেখা যায় ধীরগতির যান চলাচল।
রাইডশেয়ার ব্যবহারকারীদের ভাড়া বেড়ে যায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। অনেকেই বাসস্ট্যান্ডে আটকে পড়েন, কেউ কেউ হেঁটে ঘরে ফেরার চেষ্টা করেন
শুধু রাজধানী নয়, একই সময়ে টাঙ্গাইল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ, বরিশাল ও কুষ্টিয়া অঞ্চলেও বৃষ্টিপাতের খবর পাওয়া গেছে।
টাঙ্গাইলের কালিহাতি এলাকায় দুপুরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়ে বিকেলে তীব্র আকার নেয়। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ৩৫ মিনিটের টানা বৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে কয়েকটি সবজির ক্ষেতে জমে থাকা পানি।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, এই বৃষ্টিপাতের প্রভাব আগামী দুই দিন দেশের উত্তরাঞ্চলে অব্যাহত থাকতে পারে।
বৃষ্টির কারণে ঢাকায় শনিবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত তাপমাত্রা ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যায়।
সকাল ১০টার দিকে ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা বৃষ্টির পর নেমে আসে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে, রাতের তাপমাত্রা স্থিতিশীল থাকবে।
আবহাওয়া অফিসের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আগামী ২ থেকে ৩ দিন দেশের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে আকাশ আংশিক মেঘলা থাকবে এবং বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টি হতে পারে।
তবে সপ্তাহের মধ্যভাগ থেকে তাপমাত্রা হ্রাস পেয়ে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে শীতের আগমনী আমেজ শুরু হতে পারে বলে পূর্বাভাসে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বৃষ্টির এমন চমকপ্রদ আবহাওয়ায় কেউ ভোগান্তিতে, কেউ বা পেয়েছেন প্রশান্তি।
তরুণ তানভীর আহমেদ বলেন, গরমে অস্থির লাগছিল, এই বৃষ্টি একটু শান্তি এনে দিল।
অন্যদিকে, অফিসগামী নাসরিন সুলতানা বলেন, বৃষ্টি ভালো লাগে, কিন্তু ঢাকার রাস্তায় নামলে মনে হয় বিপদে পড়েছি।
পরিবেশবিদরা বলছেন, এমন মৌসুমান্তকালীন বৃষ্টি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক। তবে শহরের নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা এমন সুন্দর মুহূর্তকেও ভোগান্তিতে পরিণত করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রায়হান কবীর বলেন, বৃষ্টিপাত নিজে কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হলো শহরের প্রস্তুতির অভাব। আমরা ২০ মিনিটের বৃষ্টি সামলাতে পারি না, অথচ প্রতিদিন আকাশে ধোঁয়া জমে থাকে। নগর ব্যবস্থাপনা পুনর্বিবেচনা না করলে ভবিষ্যতে এক ঘণ্টার বৃষ্টি শহর অচল করে দেবে।
বিকেলের অন্ধকার, বজ্রপাত, আর ঝুমবৃষ্টি সব মিলিয়ে নভেম্বরের প্রথম দিনটি ঢাকাবাসীর মনে রেখে যাওয়ার মতোই ছিল। প্রকৃতির এই অনিশ্চিত রূপ মনে করিয়ে দিল, ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে আবহাওয়া আগাম ধারণা মেনে চলে না।
তবে দিনের শেষে একটাই উপলব্ধি গরমে ক্লান্ত নগরীর ওপর এই বৃষ্টি একফোঁটা স্বস্তি এনে দিলেও, অপ্রস্তুত শহরবাসীর কাছে সেটিই পরিণত হলো দুর্ভোগের আরেক নাম।
ইএইচ