ইয়ামিনুল হাসান আলিফ
ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ১১:৩৫ পিএম
একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের যেন নীরব পরিসমাপ্তি ঘটল। মহাপ্রয়াণে চলে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। রাজধানীর আকাশ যেন ভারী হয়ে নেমে এসেছে শোকে। সকাল থেকেই মানুষের ঢল নামে জানাজার মাঠে- লাখ লাখ জনতা, চোখে অশ্রু, হাত তুলে দোয়ার মোনাজাত।
রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার পথচলা ছিল সংগ্রাম আর অদম্য প্রত্যয়ের গল্প। এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের ছায়া পেরিয়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসা এক নারীর নাম বেগম খালেদা জিয়া। বহুবার ক্ষমতায় এসেছেন, বহুবার ক্ষমতা হারিয়েছেন; কিন্তু রাজনীতির মাঠ ছাড়েননি, করেননি আপস।
মা, মাটি ও মানুষের অধিকার আন্দোলনের প্রতীক খালেদা জিয়া জাতির কাছে ছিলেন অবিচল ও আপসহীন এক নেতৃত্বের নাম। দীর্ঘ সংগ্রাম, রাজনৈতিক নির্যাতন ও জীবনের লড়াই শেষ করে এই মহিয়সী নেত্রীর মহাপ্রয়াণে শোকে আচ্ছন্ন পুরো দেশ।
জানাজার মাঠে দেখা গেল নানা বয়সি মানুষ, বয়স্করা স্মরণ করছিলেন নব্বইয়ের গণআন্দোলনের দিনগুলো, তরুণরা শুনছিলেন সেই ইতিহাস নতুন করে। কেউ বলছিলেন, তিনি ছিলেন আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক; কেউ বলছিলেন, তিনি ছিলেন সময়ের কঠিন বাস্তবতার শিকার। মতভেদ থাকলেও আজ সবাই এক জায়গায়- শেষ বিদায়ে।
যখন জাতীয় পতাকায় মোড়া লাশবাহী গাড়িতে করে খালেদা জিয়ার মরদেহ জানাজাস্থলে আনছিল, তখন পুরো মাঠে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা। ইমামের কণ্ঠে দোয়া ভেসে এলো বাতাসে ক্ষমা, শান্তি আর জান্নাতের প্রার্থনা। সাড়ে চুয়াল্লিশ বছর আগে যেখানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে সমাহিত করা হয়েছে, সেই জিয়া উদ্যানে স্বামীর পাশেই শায়িত হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টায় সাবেক বিএনপি চেয়ারপারসনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। এর আগে বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদের সামনে জনসমুদ্রের মধ্যে খালেদা জিয়ার জানাজা হয়।
জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ এবং পুরো মানিক মিয়া অ্যাভেনিউ ছাড়িয়ে আশপাশের সব সড়ক, অলিগলি থেকে অজস্র মানুষ তাতে শরিক হন। তার জানাজাকে কেন্দ্র করে সংসদ ভবন এলাকার আশপাশে ব্যাপক লোক সমাগম হয়। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ তখন কেবল একটি সড়ক নয়। সেটি হয়ে উঠেছিল একটি জনসমুদ্র।
বিজয় সরণি, খামারবাড়ি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, মোহাম্মদপুর- সব দিক থেকে মানুষ এসে মিশে ছিল এক বিন্দুতে। তবে শহরের অন্যান্য ব্যস্ততম প্রায় সব রাস্তাই ফাঁকা দেখা গেছে। নিত্যদিনের যানজটপূর্ণ সড়কগুলো ছিল নীরব। কোথাও তেমন মানুষ নেই। সবাই যেন ছুটে গেছে মানিক মিয়া এভিনিউতে।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর সদরঘাট থেকে গুলিস্তান, প্রেসক্লাব, শাহবাগের মতো ব্যস্ততম জায়গাকে জনমানবশূন্য দেখা গেছে। তবে কাওরান বাজার মোড়ে এসে জানাজা পড়তে আসা মানুষের ভিড় দেখা যায়। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।
আরও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, আসিফ নজরুল ও আদিলুর রহমান খান, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
খালেদা জিয়ার নিজ দলের মধ্যে ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলটির নেতাকর্মীরা।
আরও ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক প্রমুখ। এর আগে বেলা ১১টা ৫ মিনিটে গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসভবন থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ নিয়ে জ্যেষ্ঠ ছেলে তারেক রহমান জানাজাস্থল জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার উদ্দেশে রওনা হন। গাড়িবহরে লাল সবুজ রঙের বাসটিও ছিল।
তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান, ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা জানাজাস্থলে যান। এই মানিক মিয়া অ্যাভেনিউতেই ১৯৮১ সালের ২ জুন খালেদা জিয়ার স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা হয়েছিল। পরে তাকে সমাহিত করা হয় চন্দ্রিমা উদ্যানে, যার বর্তমান নাম জিয়া উদ্যান। পরে স্বামীর পাশে সমাহিত করা হয় খালেদা জিয়াকে।
রাজনীতির বাইরে একজন মা, একজন স্ত্রী, একজন সংগ্রামী নারীর জীবনও স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিল। ইতিহাস তার মূল্যায়ন করবে নিজের মতো করে। কিন্তু গতকালের এই জনস্রোত বলছে খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনীতিক নন, তিনি ছিলেন একটি সময়, একটি অধ্যায়।
জানাজায় ৩২ দেশের কূটনীতিকের উপস্থিতি : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় ৩২ দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিএনপির মিডিয়া সেল জানায়, রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত জানাজায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন।