নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬, ১২:৩২ এএম
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো জ্বালানি খাত। আর এই জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গত কয়েক দশক ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল)।
১৯৫৫ সালে হরিপুরে প্রথম গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, আজ ২০২৬ সালে এসে সেই প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেনের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। একঝাঁক দক্ষ কর্মকর্তার সমন্বয়ে এসজিএফএল এখন দেশের জ্বালানি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে ‘সম্মুখ সারির যোদ্ধা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ইতিহাসের পাতা থেকে : একটি জাতির জ্বালানি বিপ্লব
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের ইতিহাস মূলত বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ইতিহাসের সমান্তরাল। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান পেট্রোলিয়াম কর্তৃক হরিপুরে গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের মাধ্যমেই এ তাঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ সম্পদের গুরুত্ব বিশ্ববাসীর নজরে আসে। ১৯৬০ সালে ছাতক সিমেন্ট কারখানায় গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। তবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ১৯৮২ সালের ৮ মে, যখন কোম্পানি আইন ১৯১৩-এর আওতায় এটি নিবন্ধিত হয়।
প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের অন্যতম স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিনটি হলো ১৯৮৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর। সেদিন হরিপুরের ৭ নম্বর কূপে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম তেল ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়, যা তৎকালীন সময়ে দেশের জ্বালানি খাতে এক বিশাল আশার আলো সঞ্চার করেছিল।
বর্তমান নেতৃত্বে আধুনিকায়ন ও নতুন দিগন্ত
বর্তমানে এসজিএফএলের হাল ধরেছেন প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন। তার দিকনির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানটি গতানুগতিক উৎপাদন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
উৎপাদন বৃদ্ধিতে সম্মুখ যোদ্ধাদের ভূমিকা
ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেনের গতিশীল নেতৃত্বে কোম্পানির কর্মকর্তারা দিনরাত নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে নতুন রূপ খনন এবং পুরাতন রূপ পুনঃখনন প্রক্রিয়ায় রেকর্ড পরিমাণ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। প্রশাসনিক সমন্বয় ও কৌশলগত পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, যা কর্মকর্তাদেরকাজের গতিকে ত্বরান্বিত করেছে। কর্মকর্তাদের মনোবল বৃদ্ধিতে বর্তমান নেতৃত্বের ‘ঐধহফং-ড়হ’ পলিসি প্রতিষ্ঠানটিকে একটি সুসংগঠিত পরিবারে রূপান্তর করেছে।
কনডেনসেট ও পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন
এসজিএফএল শুধু গ্যাস উত্তোলনেই সীমাবদ্ধ নেই। ২০০৯ সালে নিজস্ব কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট চালুর পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি দেশের পেট্রোল ও ডিজেলের চাহিদা মেটাতে বড় অবদান রাখছে। বর্তমানে রশিদপুরে স্থাপিত কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্লান্ট এবং ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিটের মাধ্যমে এখান থেকে উচ্চমানের পেট্রোল, অক্টেন, ডিজেল এবং কেরোসিন উৎপাদিত হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
৫টি গ্যাস ক্ষেত্র : দেশের জ্বালানি মানচিত্রের মূলবিন্দু
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড বর্তমানে পাঁচটি প্রধান গ্যাস ক্ষেত্র পরিচালনা করছে— হরিপুর: দেশের প্রাচীনতম ক্ষেত্র এবং একমাত্র তেল উৎপাদনকারী ক্ষেত্র। কৈলাশটিলা: উচ্চ চাপের গ্যাস এবং প্রচুর পরিমাণ কনডেনসেট সমৃদ্ধ। রশীদপুর: জাতীয় গ্রিডে বড় অংকের গ্যাস সরবরাহকারী একটি ক্ষেত্র।
বিয়ানীবাজার: এখান থেকে নিয়মিত গ্যাস ও মূল্যবান তরল হাইড্রোকার্বন পাওয়া যাচ্ছে। ছাতক: ঐতিহাসিক এই ক্ষেত্রটি পুনরায় সক্রিয় করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, মলিকুলার সিভ টার্বো এক্সপ্যান্ডার প্লানট ও এনজিএল প্লান্ট : জ্বালানি প্রক্রিয়াজাতকরণে এসজিএফএল বিশ্বমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। মলিকুলার সিভ টার্বো এক্সপ্যান্ডার প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তরল গ্যাস পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে এবং কৈলাশটিলা এনজিএল প্লান্টের মাধ্যমে উৎপাদিত এনজিএল উপজাত থেকে বহুমুখী জ্বালানি উৎপাদনের পথ প্রশস্ত করছে।
চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ : শোক থেকে শক্তিতে রূপান্তর
২০১৯ সালে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লুৎফর রহমানের আকস্মিক মৃত্যু প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। তবে সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে বর্তমান প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটিকে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক জায়গায় নিয়ে এসেছে। বর্তমান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন এবং কোম্পানি সচিবের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এসজিএফএলের তাভ্যন্তরীণ সুশাসন এখন উদাহরণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা
সরকারের ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নে এসজিএফএলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে প্রতিষ্ঠানটি নিম্নোক্ত লক্ষ্যগুলো নিয়ে কাজ করছে— গভীর কূপ খনন: মাটির অনেক গভীরে থাকা গ্যাসের স্তর অনুসন্ধানে অত্যাধুনিক থ্রি-ডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনা।
পরিবেশ সুরক্ষা: উত্তোলিত গ্যাসের সাথে আসা পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন। দক্ষতা বৃদ্ধি: কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষ ন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদান করে ‘গ্যাস তাপারেশনাল এক্সপার্ট’ হিসেবে গড়ে তোলা।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড কেবল একটি কোম্পানি নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেনের সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কোম্পানি সচিব প্রশাসনিক দক্ষতার মিশেলে এসজিএফএলের প্রতিটি কর্মকর্তা আজ একেকজন সম্মুখ যোদ্ধা।
দেশের শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের চুলা সচল রাখতে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য। প্রতিকূলতা ছাপিয়ে নতুন নতুন কূপ খনন ও অধিকতর গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে এসজিএফএল আগামী দিনে বাংলাদেশের জ্বালানি মানচিত্রে আরও উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবে।
জেএইচআর