নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ৮, ২০২৬, ১২:০৯ এএম
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং একটি রাষ্ট্রের আর্থিক সুশাসনের প্রাণকেন্দ্র হলো তার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সমপ্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে পরিবর্তন নিয়ে যে আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একজন ব্যক্তির আসা-যাওয়ার বিষয় নয়, বরং এটি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর দৃঢ়তার প্রশ্ন।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলোতে নিজেদের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে থাকে। এটি বিশ্বজুড়েই একটি প্রচলিত সংস্কৃতি। কিন্তু ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা সাধারণ মন্ত্রণালয় বা সরকারি দপ্তরের মতো নয়। এর প্রতিটি সিদ্ধান্ত সরাসরি দেশের মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের পকেটের টাকার মানের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই এই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে রাজনৈতিক পছন্দের চেয়ে ‘পেশাদারিত্ব’ এবং ‘কারিগরি দক্ষতা’ হওয়া উচিত একমাত্র মানদণ্ড।
মেয়াদের সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা : একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর যখন তার নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করার আইনি নিশ্চয়তা পান, তখন তিনি নির্ভয়ে দীর্ঘমেয়াদি এবং ক্ষেত্রবিশেষে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ড. আহসান এইচ মনসুরের বিদায় নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার মূল কারণ হলো- অনেকেই আশা করেছিলেন তিনি তার সংস্কার কর্মসূচিগুলো পূর্ণ করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদল বা ক্ষমতার প্রভাবে এই পদের পরিবর্তন প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানকে একটি বিশেষ আইনি সুরক্ষা দেয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট চাইলেই হুট করে সরিয়ে দিতে পারেন না। এই ‘লিগ্যাল শিল্ড’ বা আইনি সুরক্ষা দেয়া হয় যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করতে পারে।
কেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অপরিহার্য : কেন্দ্রীয় ব্যাংক হলো অর্থনীতির অভিভাবক। যদি এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারের একটি আজ্ঞাবহ দপ্তরে পরিণত হয়, তবে কয়েকটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। যেমন- লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি: সরকার অনেক সময় রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার জন্য বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়াতে চায়, যা দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতি ঘটায়। একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপে বাধা দিতে পারে। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা: খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করতে গভর্নরকে অনেক সময় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর হতে হয়। রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বা ভয়ের মধ্যে থাকা গভর্নর এই সাহস দেখাতে পারেন না। আন্তর্জাতিক অনাস্থা: আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করে।
নাজুক গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা : বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতন্ত্র এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। এখানে শাসনব্যবস্থা অনেক সময় সুনির্দিষ্ট নিয়মের চেয়ে ‘তাৎক্ষণিক সুবিধা’ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে। যখন কোনো দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল থাকে, তখন ক্ষমতাবানরা নিয়মকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চান। প্রতিষ্ঠানটিকে থাকে তার স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার ওপর। যদি প্রতিবার সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে বা রাজনৈতিক প্রয়োজনে কারিগরি পদগুলোতেরদবদল করা হয়, তবে দক্ষ পেশাদাররা এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করবেন। এটি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোকে ভঙ্গুর করে দেয়।
সঠিক প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যতের শিক্ষা : শাসনব্যবস্থায় ব্যক্তি নয়, বরং ‘প্রক্রিয়া’ বড় হওয়া উচিত। নিয়ম মেনে চলা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থার প্রতীক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের মতো কারিগরি ও সংবেদনশীল পদে নিয়োগ এবং অপসারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক সরকারের উচিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষায় নিজেদের প্রভাবকে সংকুচিত রাখা।
ড. মনসুরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া না হওয়া নিয়ে যে বিতর্ক, তা আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে- আমরা কি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে চাই, না কি ক্ষমতার চর্চাকে? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে আপস করার অর্থ হলো দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে জুয়া খেলা। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। নিয়ম ও স্থিতিশীলতাই হতে পারে একটি শক্তিশালী এবং মর্যাদাশীল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভিত্তি।