নিজস্ব প্রতিবেদক
মে ৮, ২০২৬, ১২:২৯ এএম
সৌদি আরব থেকে আমদানি করা এক লাখ টন অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল) খালাস শুরু হয়েছে। গত বুধবার রাত থেকে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় নোঙর করা ট্যাংকার জাহাজ থেকে ছোট লাইটার জাহাজে করে এ অপরিশোধিত তেল খালাস করা হচ্ছে। ট্যাংকার জাহাজ থেকে ক্রুড অয়েল নিয়ে প্রথম লাইটার জাহাজ গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় জেটিতে পৌঁছে।
আজ শুক্রবার দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে উৎপাদন পুনরায় শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ইরানের সঙ্গে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরুর দীর্ঘ দুই মাস পর বিকল্প পথে এই এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে দেশে পৌঁছে ট্যাংকার জাহাজ ‘এমটি নিনেমিয়া’।
গত বুধবার দুপুরে জাহাজটি ক্রুড অয়েল নিয়ে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় নোঙর করে। ইস্টার্ন রিফাইনারির উপ- মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে ট্যাংকার জাহাজ ‘এমটি নিনেমিয়া’ গত বুধবার কুতুবদিয়ায় পৌঁছেছে। এই জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নয়; লোহিত সাগর উপকূল হয়ে বাংলাদেশে এসেছে। রাতেই ওই জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে তেল খালাস শুরু হয়েছে। সকাল ১০টায় তেল নিয়ে প্রথম লাইটার জাহাজ জেটিতে ভিড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ক্রুড অয়েল সংকটে বন্ধ হওয়া ইস্টার্ন রিফাইনারি শুক্রবার থেকে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে তিনটি লাইটার জাহাজ তেল খালাস সম্পন্ন করতে হবে। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আরেকটি জাহাজে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল লোড করার শিডিউল আছে। চট্টগ্রাম বন্দর মাইলফলক অতিক্রম করেছে। শক্তিশালী করপোরেট মুনাফা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ এই উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছে।
জাপানের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের শেয়ারবাজারও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আকাশচুম্বী আয় বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। জাপানের বাইরে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ার নিয়ে গঠিত এমএসসিআই ইনডেক্স ১ শতাংশ বেড়ে নতুন শিখরে অবস্থান করছে। উল্লেখ্য যে, এই এক সপ্তাহেই সূচকটি প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামপ্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।
শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা, প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা সফল হলে তা হবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মোড়। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ডটকমের জ্যেষ্ঠ আর্থিক বিশ্লেষক কাইল রড্ডা পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, শান্তিচুক্তি কার্যকর হওয়া হবে একটি বিশাল অগ্রগতি। তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কারণ অতীতেও এমন অনেক সম্ভাবনা শেষ মুহূর্তে ভেস্তে গেছে। যদি আলোচনা ফলপ্রসূভাবে এগোতে থাকে, তবে এশিয়ার বাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
ইরান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বর্তমানে শান্তি প্রস্তাবটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে শুরু হওয়া বর্তমান সংঘাতটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করাই এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য। তবে কিছু মৌলিক বিষয়ে এখনো অমিল রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার মতো ওয়াশিংটনের কড়া শর্তগুলো নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
জ্বালানি তেলের বাজারে ব্যাপক দরপতন ও অনিশ্চয়তা : শান্তিচুক্তির খবরে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে জ্বালানি তেলের বাজার। গত বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ কমে গিয়েছিল। গতকাল সকালে এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম সামান্য বাড়লেও (ব্যারেলপ্রতি ১০২.১১ ডলার), সময়ের ব্যবধানে তা আবার কমে ৯৮ ডলারে নেমে আসে।
দীর্ঘ সময় পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নামায় আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও শঙ্কা কাটেনি। কারণ, বর্তমান দাম যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় এখনো প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। ওসিবিসি ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দিলেও তেলের দাম রাতারাতি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরবে না। কারণ হিসেবে তারা জ্বালানি অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি এবং বিভিন্ন দেশের তেলের মজুত বাড়ানোর প্রবণতাকে দায়ী করেছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের ক্রমবর্ধমান সুদহার এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এখনো বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি ও জাপানি ইয়েন : শেয়ারবাজারের এই চাঙাভাবের মধ্যে মার্কিন ডলারের দরে কিছুটা নমনীয় ভাব দেখা গেছে। প্রধান ছয়টি মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান বা ‘ডলার ইনডেক্স’ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এর বিপরীতে ইউরো এবং ব্রিটিশ পাউন্ডের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। এদিকে সবার নজর এখন জাপানি মুদ্রার দিকে। সমপ্রতি জাপানি ইয়েনের দর হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বাজার সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, নিজেদের মুদ্রাকে শক্তি দিতে টোকিও হয়তো বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু হস্তক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন তেলের দামের আরও পতন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের সুদহার কমে আসা।
ভবিষ্যৎ গতিপথ : মার্কিন কর্মসংস্থান রিপোর্টের অপেক্ষা : এশিয়ার এই উত্থানের রেশ মার্কিন বাজারেও লেগেছে। বড় বড় কোম্পানিগুলোর মুনাফা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হওয়ায় বুধবার ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলো নতুন রেকর্ড গড়েছে। তবে বাজার এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে শুক্রবার প্রকাশিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের জন্য। রয়টার্সের জরিপ অনুযায়ী, এপ্রিলে দেশটিতে নতুন কর্মসংস্থান বাড়তে পারে ৬২ হাজার, যা মার্চ মাসের তুলনায় (১ লাখ ৭৮ হাজার) বেশ কম। এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।
পরিশেষে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তি যদি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কেবল এশিয়ায় নয়, পুরো বিশ্বের সরবরাহ চেইন এবং জ্বালানি বাজারে স্থিতি ফিরিয়ে আনবে। তবে কূটনীতির এই পিচ্ছিল পথে শেষ পর্যন্ত কী ঘটে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।