ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

রক্তে ভেজা কক্ষ, স্তব্ধ ক্যাম্পাস: ৪ শিশুর আর্তনাদে ভারী কুষ্টিয়ার আকাশ

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

মার্চ ৭, ২০২৬, ০৩:১২ পিএম

রক্তে ভেজা কক্ষ, স্তব্ধ ক্যাম্পাস: ৪ শিশুর আর্তনাদে ভারী কুষ্টিয়ার আকাশ

বাতাসে আজ শুধু হাহাকার। কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চারটি কচি মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। যে বয়সে সন্তানদের মায়ের আঁচল ধরে বায়না করার কথা, সেই বয়সে তারা হাতে ধরে আছে প্লাকার্ড যাতে লেখা আমার মায়ের খুনিদের ফাঁসি চাই। তাদের চোখের জল যেন কুষ্টিয়ার তপ্ত পিচঢালা রাস্তাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বা ইবির সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী হলো কুষ্টিয়াবাসী। মায়ের লাশের পাশে নয়, বিচারে দাবিতে রাজপথে দাঁড়িয়েছে তিন কন্যা ও এক শিশুপুত্র।

তাদের অবুঝ চোখের চাহনি উপস্থিত হাজারো শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পথচারীর হৃদয়কে বিদীর্ণ করে দিয়েছে। এই মানববন্ধন যেন কেবল একটি সমাবেশ ছিল না, এটি ছিল এক চরম বিচারহীনতার বিরুদ্ধে নীরব এক আর্তনাদ।

গত ৪ মার্চ বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সাজানো গোছানো সমাজকল্যাণ বিভাগ মুহূর্তেই শ্মশানে পরিণত হয়েছিল। নিজ কক্ষ, যা একজন শিক্ষকের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সেখানেই নৃশংসভাবে খুন হন আসমা সাদিয়া রুনা। রুমের ভেতর পাওয়া যায় রক্তস্নাত নিথর দেহ। সেই একই কক্ষে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনিক হাজিরার কর্মচারী ফজলুর রহমানকে। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রুনা। 

একজন সম্ভাবনাময় শিক্ষক, একজন মমতাময়ী মা এবং একজন আদর্শ সহকর্মীকে হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে যে একটি সুরক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, দিনের আলোয় নিজ দপ্তরে কীভাবে একজন বিভাগীয় প্রধান খুন হতে পারেন এবং এই রক্ত কার হাতে লেগে আছে।

আজকের মানববন্ধনে সবচেয়ে করুণ দৃশ্য ছিল রুনার চার শিশু সন্তানের উপস্থিতি। নিহতের স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান যখন তার সন্তানদের নিয়ে রাজপথে দাঁড়ালেন, তখন চারপাশের পরিবেশ থমকে যায়।

বড় মেয়েটির চোখে পাথরচাপা কান্না, মেজো মেয়েটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মানুষের ভিড়ের দিকে, আর সব চেয়ে ছোট ছেলেটি হয়তো এখনো জানেই না তার মা আর কোনোদিন ফিরবে না। বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান কান্নায় ভেঙে পড়েন। 

তিনি বলেন, আমার সন্তানদের আমি কী জবাব দেব। ওরা যখন জানতে চায় মা কেন স্কুল থেকে ফিরছে না, আমি তখন কোথায় মুখ লুকাব। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পবিত্র জায়গায় যদি একজন শিক্ষককে এভাবে জীবন দিতে হয়, তবে এই দেশে শিক্ষা আর নিরাপত্তার কোনো মূল্য রইল না।

আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের পর তার স্বামী বাদী হয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে কর্মচারী ফজলুর রহমানকে। তবে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আরও গভীর কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রবল সন্দেহ রয়েছে। 

মামলায় আরও অভিযুক্ত করা হয়েছে সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার, সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান এবং সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাসকে। পুলিশ প্রধান আসামি ফজলুকে গ্রেপ্তার দেখালেও বাকি আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। কেন একজন উচ্চশিক্ষিত শিক্ষককে সহকর্মীদের যোগসাজশে মরতে হলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

এটি কি কেবল ব্যক্তিগত আক্রোশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে বিভাগীয় রাজনীতি ও প্রশাসনিক কোনো কোন্দল তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষক সমাজের দাবি যে তদন্ত যেন কোনো প্রভাবশালীর ছায়ায় থমকে না যায়।

আজকের মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বক্তারা বলেন, রুনার মতো একজন মেধাবী শিক্ষককে হারিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তারা হুংকার দিয়ে বলেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঘাতক ফজলুসহ মামলার সব আসামিকে আইনের আও্যায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। 

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী বলেন, যদি রুনা হত্যার সুষ্ঠু বিচার না হয়, তবে এই ক্যাম্পাস আর শান্ত থাকবে না। আমরা কলম ছেড়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হবো। একজন শিক্ষকের রক্ত রাজপথে মিশে যাবে আর খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবে এটা আমরা হতে দেব না।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে যদি শিক্ষকদের নিরাপত্তা না থাকে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়। আজকের এই মানববন্ধন থেকে একটিই বার্তা দেওয়া হয়েছে যে সন্ত্রাসের কোনো দল নেই এবং কোনো ছাড় নেই। যদি এই হত্যাকাণ্ডের হোতারা পার পেয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষকই তার দপ্তরে বসে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন না। 

খুলনার মাসুম বিল্লাহ হত্যা থেকে শুরু করে ইবি শিক্ষিকা রুনা হত্যা, দিনের আলোয় ঘটা এই অপরাধগুলো প্রমাণ করে যে অপরাধীরা এখন চরম বেপরোয়া। সরকার ও প্রশাসনের প্রতি নিহতের স্বজনদের আকুল আবেদন কেবল গ্রেপ্তার নয়, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই পাষণ্ডদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হোক।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সিসিটিভি ক্যামেরা, নিরাপত্তা প্রহরী এবং প্রশাসনিক নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন খুনি কক্ষের ভেতর ঢুকে শিক্ষককে হত্যা করল, তা নিয়ে গোয়েন্দা তদন্তের দাবি উঠেছে।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সেল গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে আজকের সমাবেশ থেকে। আসমা সাদিয়া রুনার রক্তে ভেজা মাটি আজ বিচার চাইছে। বিচার চাইছে তার সেই চার পিতৃহারা মাতৃহারা শিশু। কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সামনের সেই বিষাদময় সকালটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমাদের সমাজ কতটা পচে গেছে। 

আমরা কি কেবল মোমবাতি জ্বালিয়ে আর শোক প্রস্তাব পাস করেই আমাদের দায়িত্ব শেষ করব নাকি প্রকৃত খুনিদের মুখোশ উন্মোচন করে তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করব। সরকারের কাছে একটাই দাবি যে সন্ত্রাসের শিকড় যে যেখানেই থাকুক, তা উপড়ে ফেলতে হবে। চার শিশুর চোখের জল যেন বৃথা না যায়। রুনার বিদেহী আত্মা তখনই শান্তি পাবে, যখন তার খুনিরা তাদের কৃতকর্মের উপযুক্ত সাজা ভোগ করবে।

জেএইচআর

Link copied!