আশরাফুল আলম, চুয়াডাঙ্গা
এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ০১:০৭ পিএম
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণ আর কল্যাণের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল এই চারতলা নান্দনিক ভবন। কিন্তু উদ্বোধনের ৯ বছর পর আজ সেই ‘মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স’ কেবলই এক বিশাল আবর্জনার স্তূপ। ধুলোর আস্তরণ আর মাকড়সার জালে ঢাকা পড়েছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য বরাদ্দকৃত আধুনিক আসবাবপত্র। নামেই কমপ্লেক্স, কিন্তু বাস্তবে এটি এখন কুকুর-বিড়ালের অভয়াশ্রম আর মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানা।
প্রশাসনের উদাসীনতা, অপরিকল্পিত অবস্থান আর স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দখলের পাঁয়তারা ভেস্তে দিতে বসেছে সরকারের এই মহৎ উদ্যোগ। কোটি টাকার সরকারি সম্পদ যখন চোখের সামনে নষ্ট হচ্ছে, তখন কেবল ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মীর অভাব’ দেখিয়ে দায় সারছে উপজেলা প্রশাসন।
সরেজমিনে কার্পাসডাঙ্গা কলেজ রোডের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ৪ তলা বিশিষ্ট এই ভবনে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। ভবনের মূল ফটক ও সিঁড়িতে জমে আছে ধুলোবালি আর ময়লার স্তূপ। বাইরের দেয়ালে শেওলা জমে বিবর্ণ হয়ে গেছে নোনা ধরা পলেস্তারা। ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতেই নাকে লাগে তীব্র দুর্গন্ধ। প্রতিটি কক্ষের শাটারে মরিচা ধরেছে, জানালার কাঁচ ভাঙা। সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে তৃতীয় তলার কনফারেন্স রুমে। সেখানে থাকা দামী আসবাবপত্র পুরু ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে। টয়লেটের বেসিন থেকে শুরু করে জেনারেটরের মতো মূল্যবান যান্ত্রিক ডিভাইসগুলোও নষ্ট হওয়ার পথে। মানুষ নয়, ভবনজুড়ে এখন কেবল কুকুর-বিড়ালের বিচরণ। স্থানীয়রা একে এখন ‘ভূতুড়ে বাড়ি’ হিসেবেই চেনে।
তথ্যমতে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ২০১৫ সালে এই ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ করে। ওই বছরের ১১ অক্টোবর এটি উদ্বোধন করা হয়। ভবনের আয়ের উৎস হিসেবে নিচে দোকানঘর এবং ওপরে অফিস ও আধুনিক কনফারেন্স রুম রাখা হয়েছিল। তবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, ভবনটি নির্মাণের ক্ষেত্রে বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। দামুড়হুদা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে কার্পাসডাঙ্গা বাজারে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার বয়স এখন ৯০-এর কোটায়। এই বয়সে এত দূরে যাতায়াত এবং লিফটবিহীন চারতলা ভবনের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা তাঁদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও সমন্বয়ের অভাবকেও ভবনটি তালাবদ্ধ থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভবনটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় স্থানীয় সচেতন মহলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী কিছু রাজনৈতিক নেতা পরোক্ষভাবে ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। সঠিক তদারকি না থাকায় রাতের বেলা এখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ছে। দ্রুত এটি সচল করা না হলে সরকারি এই বিশাল সম্পদ পুরোপুরি মাদক ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. উবায়দুর রহমান সাহেল জানান, “মূলত পরিচ্ছন্নতা কর্মীর অভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এরই মধ্যে ভবনটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছি এবং বর্তমানে কাজ চলছে। ভবনটি যাতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই দৃষ্টিনন্দন ভবনটি এভাবে নষ্ট হওয়াকে জাতীয় সম্পদের অপচয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক সেবার আওতায় আনতে এবং এই সম্পদ রক্ষায় ভবনটি দ্রুত সংস্কার করে সচল করার দাবি জানিয়েছে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ জনগণ।
এএন