নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬, ১১:৫৪ এএম
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে অবৈধ অর্থের ব্যবহার এবং কালোটাকার ছড়াছড়ি রুখতে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই বিশেষ সীমাবদ্ধতা কার্যকর থাকবে।
বর্তমানে বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো সেবায় একজন গ্রাহক দিনে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাঠাতে পারলেও নির্বাচনের আগে এই সীমা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী:
সর্বোচ্চ দৈনিক লেনদেন: একজন গ্রাহক দিনে সব মিলিয়ে ১০ হাজার টাকার বেশি পাঠাতে পারবেন না।
একক লেনদেনের সীমা: প্রতিবার টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১,০০০ (এক হাজার) টাকার বেশি লেনদেন করা যাবে না।
লেনদেনের সংখ্যা: দিনে সর্বোচ্চ ১০ বারের বেশি টাকা পাঠানো যাবে না।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সুপারিশের ভিত্তিতে বিএফআইইউ এই প্রস্তাবনা তৈরি করেছে। উদ্দেশ্য হলো, ক্ষুদ্র অংকের লেনদেনের আড়ালে যাতে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিলি করা সম্ভব না হয়।
সাধারণত ব্যাংকের অ্যাপ (যেমন: আস্থা, সেলফিন, সিটিটাচ, নেক্সাস পে) ব্যবহার করে গ্রাহকরা প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা মুহূর্তেই অন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতে পারেন। বর্তমানে দিনে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের সুযোগ থাকলেও নির্বাচনের এই সংবেদনশীল সময়ে ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি (P2P) ফান্ড ট্রান্সফার সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অ্যাপ বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে অন্য কোনো ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো সম্ভব হবে না। তবে জরুরি প্রয়োজনে ব্যাংকিং চ্যানেলের অন্যান্য মাধ্যম খোলা রাখা হতে পারে।
নির্বাচনের আগমুহূর্তে ব্যাংক থেকে ঢালাওভাবে নগদ টাকা উত্তোলনের প্রবণতা বাড়ে। এটি নিয়ন্ত্রণে গত ১১ জানুয়ারি থেকেই নজরদারি বাড়িয়েছে বিএফআইইউ। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী:
১০ লাখ টাকার সীমা: কোনো একক হিসাবে এক দিনে ১০ লাখ বা তার বেশি টাকা জমা বা উত্তোলন করলে তার বিস্তারিত প্রতিবেদন বিএফআইইউ-তে জমা দিতে হবে।
সাপ্তাহিক প্রতিবেদন: ব্যাংকগুলোকে এখন থেকে প্রতি সপ্তাহের নগদ লেনদেনের রিপোর্ট পরবর্তী সপ্তাহের তিন কার্যদিবসের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হবে।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: তথ্য গোপন করলে বা ভুল তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের আওতায় কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিজিটাল মাধ্যমে অতি দ্রুত টাকা পাঠানোর সুবিধা থাকায় প্রার্থীরা অনেক সময় মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের কাছে মুহূর্তেই নির্বাচনী খরচ বা প্রভাব বিস্তারের টাকা পৌঁছে দেন। লেনদেন সীমা ১ হাজার টাকায় নামিয়ে আনলে এবং দিনে ১০ হাজার টাকার ক্যাপ বসিয়ে দিলে এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়বে।
নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার স্বার্থে এই পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে যারা জরুরি প্রয়োজনে মোবাইল ব্যাংকিং বা ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের ওপর নির্ভরশীল, ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের বড় ধরণের সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, জাতীয় স্বার্থে এই সাময়িক ত্যাগ স্বীকার করা জরুরি।
জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আর্থিক খাতের এই নজিরবিহীন কড়াকড়ি শেষ পর্যন্ত কালোটাকার প্রভাব কতটুকু কমাতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এএন