আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জানুয়ারি ১১, ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম
ভারতের সংবিধান বনাম ধর্মীয় সভ্যতা—এই দুই মেরুর লড়াই এখন তুঙ্গে। একদিকে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি স্বপ্ন দেখছেন হিজাব পরা এক নারী ভারতের মসনদে বসবেন, অন্যদিকে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দাবি, ভারত হিন্দু সভ্যতার দেশ এবং এখানে প্রধানমন্ত্রী সবসময় হিন্দুই হবেন।
মুম্বাইয়ের আসন্ন পুরভোটের প্রাক্কালে দুই নেতার এই আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে ঝড় উঠেছে।
মহারাষ্ট্রের সোলাপুরে এক নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় আসাদউদ্দিন ওয়াইসি ভারতের সংবিধানের অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্ষমতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে বলেন, পাকিস্তানের সংবিধানে বাধ্যবাধকতা আছে যে সেখানে কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষই শীর্ষ পদে বসতে পারেন। কিন্তু ড. বি আর আম্বেদকরের দেওয়া ভারতের সংবিধান অনেক বেশি প্রজ্ঞাপূর্ণ ও উদার। এখানে জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ নির্বিশেষে যে কেউ প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা মেয়র হতে পারেন।
ওয়াইসি তার রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ব্যক্তিগত ইচ্ছার কথা জানিয়ে বলেন, আমার স্বপ্ন, একদিন ভারতের কোনো এক কন্যা হিজাব মাথায় দিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন। আমাদের সংবিধান সেই অধিকার প্রতিটি ভারতীয় নাগরিককে দিয়েছে।
ওয়াইসির এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি সাংবিধানিক অধিকারের কথা স্বীকার করলেও ভারতের আত্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। হিমন্ত বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানে কোনো আইনি বাধা নেই ঠিকই, কিন্তু ভারত মূলত একটি হিন্দু জাতি এবং হিন্দু সভ্যতার কেন্দ্র। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, এই দেশের প্রধানমন্ত্রী সবসময় একজন হিন্দুই হবেন।
হিমন্তের এই মন্তব্যকে বিরোধীরা ‘সংবিধানের অবমাননা’ হিসেবে দেখছেন, কারণ ভারতের সংবিধানে রাষ্ট্রকে 'ধর্মনিরপেক্ষ' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মন্তব্যের পর নাগপুরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে পাল্টা আক্রমণ করেন ওয়াইসি। তিনি কৌতুক ও তাচ্ছিল্য মিশিয়ে বলেন, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মাথায় সম্ভবত টিউবলাইট আছে, যা দেরিতে জ্বলে। তিনি সংবিধানের মর্মার্থ বোঝেন না।
ওয়াইসি আরও যোগ করেন, সংবিধানের কোথায় লেখা আছে যে প্রধানমন্ত্রী কেবল এক বিশেষ সম্প্রদায়েরই হবেন? এই দেশ যেমন আস্তিকদের, তেমনি নাস্তিকদেরও। যারা সংবিধানের বদলে সংকীর্ণ মানসিকতা নিয়ে চলেন, তারাই কেবল এমন মন্তব্য করতে পারেন।
এই বিতর্কে যোগ দিয়েছেন বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র শেহজাদ পুনাওয়াল্লা। তিনি সরাসরি ওয়াইসিকে লক্ষ্য করে একটি ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। পুনাওয়াল্লা বলেন, ওয়াইসি যদি সত্যিই নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী হন এবং হিজাব পরা প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন দেখেন, তবে তিনি আগে তার নিজের দল এআইএমআইএম-এর সভাপতির পদে কোনো হিজাব পরিহিত নারীকে বসিয়ে দেখান। মুখে আদর্শের বুলি আওড়ানো সহজ, কিন্তু নিজের সংগঠনে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কের মূল লক্ষ্য মুম্বাই পৌরসভা নির্বাচন। আগামী ১৫ জানুয়ারি ভোটগ্রহণ এবং ১৬ জানুয়ারি ফলাফল ঘোষণা করা হবে। মুম্বাইয়ের বিশাল মুসলিম ও অভিবাসী ভোটব্যাংক টানতে ওয়াইসি যখন সংবিধান ও হিজাবের তাস খেলছেন, বিজেপি তখন ‘হিন্দু সভ্যতা’র জিগির তুলে তাদের কোর ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছে।
এএন