নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ২২, ২০২৬, ১২:৫০ এএম
পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে প্রতি বছরই কোনো না কোনোভাবে অসাধু হজ এজেন্সিগুলোর প্রতারণা, চরম অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের শিকার হতে হয় দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের। তবে এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে এবং হজ ব্যবস্থাপনায় পূর্ণাঙ্গ শৃঙ্খলা ফেরাতে এবার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে সরকার।
চলতি ২০২৬ সালের হজ মৌসুমে নানা অনিয়ম, চরম হয়রানি, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সৌদি সরকারের স্পষ্ট নির্দেশাবলী লঙ্ঘনের অভিযোগে অর্ধশতাধিক হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে ১৭টি এজেন্সিসহ একাধিক সংস্থাকে কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ দেয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে, আগামী ২০২৭ সালের হজ ব্যবস্থাপনাকে শতভাগ শৃঙ্খলার আওতায় আনতে এবং সৌদি সরকারের সেন্ট্রাল কম্পিউটারাইজড ও ডিজিটাল সিস্টেমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চার মাস আগেই হজের নতুন ও কঠোর রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার।
গত ২৬ মে অনুষ্ঠিত পবিত্র হজে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮ হাজার ৫০০ ধর্মপ্রাণ মুসলমান অংশ নেন। এরমধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন হজযাত্রী পাঠাতে নিবন্ধিত মোট ৭৫৮টি এজেন্সি নিয়োজিত ছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রতি বছরের মতো এবারও কিছু এজেন্সির চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, অবহেলা ও অতিরিক্ত মুনাফা লোভের কারণে হাজিদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর অভিযুক্ত এজেন্সির সংখ্যা ৫০টি ছাড়িয়ে যেতে পারে। সৌদি আরব থেকে সরাসরি আসা অভিযোগগুলো আগামী এক মাসের মধ্যে দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও স্থানান্তর অনিয়ম: প্রাক-নিবন্ধিত হজযাত্রীদের অন্য এজেন্সিতে নিয়মবহির্ভূত স্থানান্তর, অন্যায়ভাবে নিবন্ধন বাতিল এবং সময়মতো সৌদি আরবে পাঠাতে ব্যর্থ হওয়াসহ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে গ্রিন এভিয়েশন, এয়ার রয়্যাল অ্যাভিয়েশন, নর্দার্ন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, বাপারি এয়ার সার্ভিস এবং এয়ার স্টেশন ইন্টারন্যাশনাল-এর মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
অর্থ আত্মসাৎ ও জরিমানা উদ্ধার: লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পরও তিনটি এজেন্সি অবৈধভাবে প্রায় ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে। পরে ধর্ম মন্ত্রণালয় কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে এই অর্থ উদ্ধার করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হাজিদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। আইনি ব্যবস্থা: ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১’ অনুযায়ী আনসারি ওভারসিজ, রিলেশন ট্রাভেলস এবং নর্দার্ন ট্যুরস-এর মতো এজেন্সির কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে ভুক্তভোগী হাজিদের বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে এসব অভিযুক্ত এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল, স্থগিতকরণ বা জামানত বাজেয়াপ্ত করার আইনি প্রক্রিয়া চলমান।
কার্যক্রম স্থগিত: হাজিদের লাগেজ হারানো, চরম নিম্নমানের খাবার পরিবেশন এবং অনুমোদিত এয়ারলাইন্সের বাইরে নিয়ম ভেঙে টিকিট কাটার অভিযোগে লাকি ট্রাভেলস ও খোয়াই এয়ার ট্রাভেলস-এর মতো এজেন্সির কার্যক্রম আগামী দুই বছরের জন্য স্থগিতকরণসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
চলতি বছর হজের অন্যতম আলোচিত ও বড় অনিয়ম ধরা পড়েছে কোরবানির অর্থ লেনদেনে। সৌদি সরকারের নির্ধারিত অনলাইন ‘নুসুক মাসার’ প্ল্যাটফর্মের বাইরে গিয়ে কিছু এজেন্সি হাজিদের কাছ থেকে নগদ টাকা নিয়েও কোরবানির কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে পারেনি। অনেক এজেন্সি শুধু ছাগল কেনার ভুয়া রসিদ দেখিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করেছে যা সৌদি নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। এই গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে ইতোমধ্যে ৫টি ট্রাভেল এজেন্সিকে শো-কজ করা হয়েছে— ১. প্রত্যাশা ট্রাভেলস, ২. দৈফুর রহমান ট্রাভেলস, ৩. গ্লোবাল ট্রাভেলস, ৪. মিডিয়া ট্রাভেলস, ৫. দারুল ইমান ইন্টারন্যাশনাল।
সুষ্ঠু ও পেশাদার হজ ব্যবস্থাপনার স্বার্থে এবার নিষ্ক্রিয় ও ছোট এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।
টানা তিন বছরের শর্ত: যোগ্য তালিকায় নাম থাকার পরও যারা বিগত ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর ৪০ জনের কম হজযাত্রী নিবন্ধন করেছে এবং চলতি ২০২৬ সালে একটিও নিবন্ধন করাতে পারেনি, সেসব এজেন্সিকে ২০২৭ সালের হজ কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা হবে।
সর্বনিম্ন কোটা বাধ্যবাধকতা: প্রতিটি এজেন্সিকে ন্যূনতম একজন গাইড সমসংখ্যক অর্থাৎ ৪৬ জন হজযাত্রী বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করাতেই হবে। ব্যর্থ হলে তাদের হজযাত্রীদের অন্য এজেন্সির সঙ্গে সমন্বয় বা স্থানান্তর করতে হবে।
এর ফলে আগামী ২০২৭ সালের হজের জন্য যোগ্য ও সক্রিয় এজেন্সির সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় একটি পেশাদার কাঠামোগত রূপ ফিরবে।
২০২৭ সালের হজ নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় মৌলিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এখন থেকে নিবন্ধনের শুরুতেই ডিজিটাল সিস্টেমে হাজিকে স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে তিনি কোন ধরণের হজ পালন করবেন (হজে তামাত্তু, কিরান নাকি ইফরাদ)। এর ফলে শুরুতেই নিশ্চিত হওয়া যাবে কতজন হাজির কোরবানি বাধ্যতামূলক। সেই অনুযায়ী নিবন্ধনের সময়ই ‘নুসুক’ সিস্টেমের ই-ওয়ালেটের মাধ্যমে কোরবানির অর্থ সরাসরি সৌদি আরবের নির্ধারিত অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টে চলে যাবে, যা এজেন্সিগুলোর অনিয়মের পথ পুরোপুরি বন্ধ করবে।
হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আয়াতুল ইসলাম জানান, সৌদি আরব এখন পুরো হজ ব্যবস্থাপনাকে সেন্ট্রাল ও ফুল কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের আওতায় নিয়ে এসেছে। তারা জুলাইয়ের মধ্যেই তাঁবু বুকিং ও আবাসন চূড়ান্ত করতে চায়। তাই আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দ্রুত ও বেশি সংখ্যক নিবন্ধন নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘সৌদির নতুন নীতিমালার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক মানসিকতায় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত শেষ মুহূর্তে নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত। গ্রামগঞ্জে এখনো অনেকেই ভাবেন শেষ সময়েও নিবন্ধন করে হজে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু এই নতুন ডিজিটাল ও কম্পিউটারাইজড বাস্তবতায় পুরোনো মানসিকতা আর একেবারেই কার্যকর হবে না।’ সর্বোপরি, হজ একটি পবিত্র ও ধর্মীয় শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত।
বছরের পর বছর ধরে অসাধু কিছু হজ এজেন্সির সিন্ডিকেট ও অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ হাজিদের যে মানবিক ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে, সরকারের বর্তমান কঠোর পদক্ষেপ ও অগ্রিম ডিজিটাল রোডম্যাপ তা দূর করতে সহায়ক হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।