আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম
একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই পরাশক্তি চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৬ সালের শুরুতেই এই দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে এক তাৎপর্যপূর্ণ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত বুধবার চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যেকার এই আলোচনায় উঠে এসেছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা, বাণিজ্য, পারস্পরিক উদ্বেগ এবং স্পর্শকাতর তাইওয়ান ইস্যু।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আশা প্রকাশ করেছেন যে, ঝড়ো পরিস্থিতির মধ্যেও চীন-মার্কিন সম্পর্কের বিশাল জাহাজটিকে তিনি এবং ট্রাম্প মিলে স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং বিশ্ববাসীর কল্যাণে বড় ও ভালো কিছু অর্জন করবেন।
ফোনালাপের শুরুতে শি জিনপিং গত বছরের সফল কূটনৈতিক তৎপরতার কথা স্মরণ করেন। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সফল বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
শি বলেন, সেই বৈঠকের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের যে দিকনির্দেশনা ঠিক করা হয়েছিল, তা কেবল দুই দেশের মানুষ নয়, বরং পুরো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন।
গত এক বছরে তাঁদের মধ্যে যে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে উঠেছে, তার ওপর ভিত্তি করেই ২০২৬ সালকে একটি দ্বিপাক্ষিক সফলতার বছরে পরিণত করতে চান তিনি। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেমন কিছু বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে, চীনেরও তেমনি নিজস্ব কিছু উদ্বেগ রয়েছে।
তবে তিনি এক অনন্য কূটনৈতিক দর্শন তুলে ধরে বলেন, চীন সবসময় যা বলে তা-ই করে এবং নিজের কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখে। দুই পক্ষ সমতা, শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে একই দিকে কাজ করলে উদ্বেগগুলো সমাধান করা সম্ভব।
শি জিনপিংয়ের এই মন্তব্যে মূলত বাণিজ্য যুদ্ধ এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ফোনালাপে উঠে আসে ২০২৬ সালের বিশেষ কিছু প্রেক্ষাপট, যা উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এ বছর থেকে চীন তাদের ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শুরু করতে যাচ্ছে, যা দেশটির পরবর্তী কয়েক দশকের উন্নয়নের নীল নকশা। যুক্তরাষ্ট্র এ বছর তাদের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী বা সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল উদযাপন করবে।
আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে এ বছর চীন এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন বা এপেক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করবে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে জি-২০ সম্মেলন।
শি জিনপিং মনে করেন, এই বড় বড় ইভেন্টগুলোর আগে দুই দেশের উচিত আলোচনা বাড়ানো, মতপার্থক্যগুলো সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ব্যবহারিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো প্রসারিত করা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক পয়েন্ট তুলে ধরে শি জিনপিং বলেন, একটি ভালো কাজ করা সবসময়ই সঠিক, তা সে যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন। আর একটি খারাপ কাজ করা সবসময়ই ভুল, তা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন।
তিনি মনে করেন, বড় কোনো পরিবর্তনের অপেক্ষায় না থেকে ধাপে ধাপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অগ্রগতির মাধ্যমেই পারস্পরিক আস্থা বা মিউচুয়াল ট্রাস্ট গড়ে তোলা সম্ভব। তাঁর লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সহযোগিতার বছরে রূপান্তর করা।
ফোনালাপের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশটি ছিল তাইওয়ান নিয়ে। শি জিনপিং পুনরায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, তাইওয়ান ইস্যু হলো চীন-মার্কিন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল বিষয়।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাইওয়ান চীনের ভূখণ্ড। চীন অবশ্যই তার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করবে এবং কখনোই তাইওয়ানকে আলাদা হতে দেবে না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করার আহ্বান জানান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই ফোনালাপে অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তিনি শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করে বলেন যে, বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল দিক ছিল, প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে তাঁর চমৎকার ব্যক্তিগত রসায়ন রয়েছে এবং দুই দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য বর্তমানে ভালো অবস্থানে আছে। ট্রাম্প জানান যে, তিনি চীনকে সফল হতে দেখতে চান এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নে আরও কাজ করতে আগ্রহী।
তাইওয়ান নিয়ে চীনের আবেগ ও অনুভূতির বিষয়টি তিনি বুঝতে পারেন বলে প্রেসিডেন্ট শিকে আশ্বস্ত করেন। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেন যে, তাঁর বর্তমান প্রেসিডেন্সি চলাকালীন দুই দেশের সম্পর্ক একটি সুশৃঙ্খল এবং শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।
শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ফোনালাপ ২০২৬ সালের বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘোরানোর একটি সংকেত। বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির নেতার এমন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতিশ্রুতি নিশ্চিতভাবেই আন্তর্জাতিক মহলে স্বস্তি জোগাবে।
জেএইচআর