আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্চ ৮, ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম
ইরানের রাজধানী তেহরান এখন এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। শনিবার দিবাগত রাতে ইরানের কৌশলগত তেল স্থাপনাগুলোতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন হামলার পর সেখানে ‘অ্যাসিড বৃষ্টি’র (Acid Rain) প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এক জরুরি বিবৃতিতে দেশটির নাগরিকদের এই মরণঘাতী বৃষ্টি ও বিষাক্ত বায়ু থেকে সুরক্ষা পেতে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে।
শনিবার রাতের হামলায় উত্তর-পশ্চিম তেহরানের শাহরান তেল ডিপোসহ অন্তত ৩০টি তেল মজুত কেন্দ্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল ও রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ ভস্মীভূত হয়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে।
রেড ক্রিসেন্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “তেল স্থাপনায় বিস্ফোরণের ফলে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত হাইড্রোকার্বন, সালফার ডাই অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে মিশে মেঘের স্তরে প্রবেশ করেছে। এই রাসায়নিক মিশ্রণ যখন বৃষ্টির পানির সাথে বিক্রিয়া করবে, তখন তা অত্যন্ত বিপজ্জনক অ্যাসিডে পরিণত হবে।”
রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি আজ রোববার ভোরে এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে তেহরানের বাসিন্দাদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা জারি করেছে।
বৃষ্টি চলাকালীন তো বটেই, এমনকি বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরেও ঘরের বাইরে বের না হতে বলা হয়েছে। কারণ, উত্তপ্ত মাটি থেকে অ্যাসিড মিশ্রিত পানি বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে বিষাক্ত পদার্থের ঘনত্ব কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সিল করা খাবারের প্যাকেট বা কন্টেইনার খোলার আগে তা ভালো করে পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে, কারণ কন্টেইনারের গায়ে জমে থাকা অণুবীক্ষণিক অ্যাসিডিক কণা খাবারকে দূষিত করতে পারে।
সম্ভব হলে পানি পরিশোধন ব্যবস্থার ফিল্টার প্রতিস্থাপন করতে বলা হয়েছে, কারণ বিষাক্ত পানি পুরোনো ফিল্টারগুলোকে স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দিতে পারে।
রেড ক্রিসেন্ট সতর্ক করেছে যে, এই বিষাক্ত বায়ু ও বৃষ্টির কারণে বাসিন্দাদের দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের জটিলতা এবং ত্বকের মারাত্মক রোগ দেখা দেওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
বিবিসি ফার্সি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হামলার ১০ ঘণ্টা পার হওয়ার পরও তেহরানের শাহরান তেল ডিপোসহ বেশ কিছু জায়গায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আকাশচুম্বী আগুনের কুণ্ডলী এবং সেখান থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া পুরো শহরের দৃশ্যমানতা কমিয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে দেখা গেছে, ফেটে যাওয়া তেলের পাইপলাইন থেকে জ্বলন্ত তেল ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায় ‘আগুনের নদী’র মতো প্রবাহিত হচ্ছে।
শনিবার রাতের এই সম্মিলিত হামলায় অন্তত ৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। তেলের ডিপো ছাড়াও একটি পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্টে আঘাত হানা হয়েছে, যার ফলে তেহরানের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এই হামলাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের খবর এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই চরম অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতেও কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। তেলের মজুত পুড়ে যাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় আজ বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। আজ সকালেই বাংলাদেশের জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই দেশে জ্বালানি রেশনিং অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
তেহরানের এই বিপর্যয় প্রমাণ করছে যে, আধুনিক যুদ্ধ কেবল সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি প্রকৃতির ওপর এমন এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে বেড়াতে হয়। অ্যাসিড বৃষ্টির এই শঙ্কা ইরানকে এক নতুন মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং এই পরিবেশগত দুর্যোগ কীভাবে মোকাবিলা করা হয়, তার দিকে।
এএন